Tuesday, 26 April 2011

লাঠিচার্জে আহত শতাধিক বায়তুল মোকাররম রণক্ষেত্র : পুলিশ-জামায়াত সংঘর্ষ, টিয়ারশেল গুলি ও














স্টাফ রিপোর্টার
মারমুখী পুলিশের অতর্কিত হামলা, বেধড়ক লাঠিচার্জ, বৃষ্টির মতো রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপে গতকাল বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ-মিছিল পণ্ড করতে পুলিশ এ হামলা চালায়। বেপরোয়া পুলিশের নির্মম নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি বায়তুল মোকাররমে নামাজে আসা মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ। বুট পায়ে পুলিশ উত্তর গেট দিয়ে মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের নির্বিচারে লাঠিপেটা করে। একই সঙ্গে মসজিদের ভেতরে রায়ট কার থেকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও পানিকামান থেকে রঙিন পানি নিক্ষেপ করা হয়। হামলার পর জামায়াত কর্মীরাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় আশপাশের এলাকায় আতঙ্কিত মানুষ ছোটাছুটি শুরু করে। বন্ধ হয়ে যায় যানচলাচল ও দোকানপাট। এ ঘটনায় পথচারীসহ শতাধিক জামায়াত কর্মী আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় পথচারীসহ অর্ধশতাধিক জামায়াত-শিবির কর্মীকে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের নগ্ন হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এদিকে এ হামলার প্রতিবাদে আজ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে সংগঠনটি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ শীর্ষ নেতাদের প্রতি অবিচার, নির্যাতন ও রিমান্ডে নেয়ার প্রতিবাদে এবং তাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল বিকাল সোয়া ৫টায় মুক্তাঙ্গনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর থেকেই মু্ক্তাঙ্গন, বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ রণপ্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান নেয়। পল্টন মোড়ে তিনটি পানিকামান, বিশেষ বাহন এপিসি, প্রিজনভ্যান, রায়ট কারসহ দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী আসরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে জামায়াতের মহানগর সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ এমপি, সহকারী সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম বুলবুল ও মাওলানা আবদুল হালিমের নেতৃত্বে একটি মিছিল মু্ক্তাঙ্গনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের বাকবিতণ্ডা হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ শুরু করে ছত্রভঙ্গের চেষ্টা করে। তারপরও নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ের কাছে পৌঁছলে সামনে ও পেছন থেকে পুলিশ তাদের ঘেরাও এবং লাঠিচার্জ শুরু করে।
এ সময় বায়তুল মোকাররমের আশপাশে থাকা কয়েক হাজার জামায়াত কর্মী জড়ো হয়ে রাস্তা দখলে নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ এ সময় কয়েকশ’ রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে দৈনিক বাংলা থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কাঁদানে গ্যাসের কারণে জামায়াত কর্মী ছাড়াও বাসযাত্রী ও পথচারীরা ছোটাছুটি শুরু করে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে মহিলাসহ অনেক মানুষ। আশপাশের বিভিন্ন মার্কেট ও বায়তুল মোকাররম মসজিদে আশ্রয় নেন অনেকে। পরে পুলিশ বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর পাশের সিঁড়িতে জুতাপায়ে উঠে মুসল্লিদের ধাওয়া করে এবং তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও রঙিন পানি নিক্ষেপ করে। ফলে জামায়াত-শিবির কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মুসল্লিরাও মসজিদে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। মাগরিবের নামাজের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা বেরিয়ে যান। এ ঘটনায় পথচারী, হকারসহ শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী আহত হন। ভাংচুর হয় ৫-৬টি বাস ও প্রাইভেটকার। ফুটপাতের দোকানপাট লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ঘটনাস্থল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় সাধারণ মানুষসহ অর্ধশতাধিক জামায়াত কর্মীকে।
এদিকে প্রায় দু’ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের পর জামায়াত কর্মীরা রাজপথ ছেড়ে পুরানাপল্টনের মহানগর অফিসের কাছে জড়ো হয়ে সমাবেশে মিলিত হন। এসময় সেখানেও পুলিশ হানা দিয়ে ব্যাপক টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস ঘেরাও করে রাখে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে অফিস চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমির রফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ এমপির পরিচালনায় সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনীম আলম। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা এটিএম মাসুম, মহানগরী সহকারী সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম বুলবুল ও মাওলানা আবদুল হালিম প্রমুখ।
প্রতিবাদ সমাবেশে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, জামায়াতের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের হামলা প্রমাণ করে সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। মূলত সরকার জনগণকে ভয় পায়। কারণ তারা দেশ পরিচালনায় সার্বিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আর নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার জন্যই বিরোধী দলের ওপর দলন-পীড়ন চালাচ্ছে। সরকার পুলিশ বাহিনীকে নিরস্ত্র জনতার ওপর লেলিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে প্রমাণ করেছে আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী দল। ইতিহাস সাক্ষী স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পরিণাম কখনও ভালো হয় না। তাদের লজ্জাজনক পরিণতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, সরকার ক্ষমতার দম্ভে ও পেশিশক্তির জোরে জনগণের আন্দোলন ঠেকানোর অপচেষ্টা করছে। কিন্তু এসব করে জনতার আন্দোলন ঠেকানো যায় না। সরকার জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে রিমান্ডের নামে অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। তারা আবারও দলীয় প্রসিকিউশনের মাধ্যমে শীর্ষ নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করার জন্য রিমান্ড চেয়েছে। কিন্তু কথিত রিমান্ডের নামে যদি শীর্ষ নেতাদের জীবনকে সঙ্কটাপন্ন করা হয় তাহলে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য সরকারকেই দায়ী থাকতে হবে। তাদের কিছু হলে এদেশের মানুষ ঘরে বসে তামাশা দেখবে না। তারা সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের পতন ঘটিয়ে নেতাদের মুক্তি নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, দেশ পরিচালনায় সরকারের উপর্যুপরি ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগ অবসানের জন্য আন্দোলন শুরু করেছি। জনগণের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সরকার যদি মনে করে জুলুম-নির্যাতন ও পুলিশ দিয়ে জনগণের এ আন্দোলন বন্ধ করবে তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। মূলত জুলুম-নির্যাতন তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করবে।
অধ্যাপক তাসনীম আলম বলেন, সরকার জনতার ওপর পুলিশ লেলিয়ে জনগণের আন্দোলনকে নস্যাত্ করতে চায়। তারা বিনা উস্কানিতে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিলে হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বরং তারা গণতন্ত্রবিরোধী ফ্যাসিবাদী। তাই এই ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলে ব্যর্থ সরকারের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরকার কায়েম করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ দিয়ে হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস করে না বরং তারা এখনও একদলীয় বাকশালে বিশ্বাস করে। তাই দেশের মানুষ গণতন্ত্রবিরোধী এই সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তিনি সরকারের পতনের লক্ষ্যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। প্রসঙ্গত, প্রধান অতিথির বক্তব্য চলাকালে পুলিশ অতর্কিতভাবে সিটি অফিস চত্বরে সমাবেশে হামলা চালায় এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু জনতার উপর্যুপরি প্রতিরোধের মুখে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। মাগরিবের নামাজ চলাকালে পুলিশ মুসল্লিদের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করলেও জনতার প্রতিরোধে তাও ব্যর্থ হয়। এদিকে গতকাল জামায়াতের মিছিলে হামলার ঘটনায় আজ দলের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলন করা হবে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে
।

সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল : ব্যাপক সংঘর্ষ










স্টাফ রিপোর্টার
বেপরোয়া পুলিশি অ্যাকশন ও শাসক দলের ক্যাডারদের ব্যাপক হামলা-সংঘর্ষ-সহিংসতার মধ্য দিয়ে গতকাল ওলামা মাশায়েখদের হরতাল সারাদেশে সর্বাত্মকভাবে পালিত হয়েছে। দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজধানীর পল্টন, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, ধামরাই, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফরিদপুরের নগরকান্দা, খুলনা, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকা। পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে শান্তিপূর্ণ মিছিলরত হরতাল সমর্থক মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক-মুসল্লিদের ওপর মারমুখী সশস্ত্র পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। লাঠিপেটা করে রাস্তায় ফেলে বুটের লাথি মেরে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে পুলিশ ক্ষতবিক্ষত করেছে মুসল্লিদের।
কোরআনবিরোধী নারীনীতি, ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতি এবং ফতোয়াবিরোধী রায় বাতিলের দাবিতে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন পরিষদ আহূত এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম সমর্থিত গতকালের হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। দেশব্যাপী সড়ক যোগাযোগ ছিল বন্ধ। রাজধানীর ভিআইপি সড়কে পুলিশ পাহারায় সীমিতসংখ্যক যানবাহন চলাচল করলেও দূরপাল্লার যানবাহন চলেনি। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ছিল প্রায় যানবাহনশূন্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হরতাল সমর্থকদের অবরোধে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনে রেল চলাচলও বিঘ্নিত হয়। হরতাল ঠেকাতে পুলিশ ঢাকায় ২২৬ জনসহ সারাদেশে ৫ শতাধিক হরতাল সমর্থক মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ, বুট ও রাইফেলের বাঁটের আঘাত, রাবার বুলেট ও শটগানের গুলিতে আহত হয়েছে তিন শতাধিক। এদের মধ্যে ৮৭ জন গুরুতর আহত হয় বলে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি দাবি করেছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ জন।
গতকাল ফজরের নামাজের পর থেকেই কাফনের কাপড় পরে কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন হরতাল সমর্থক ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকরা রাস্তায় নামেন। তারা নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে রাজপথ মুখরিত করে তোলেন। রাস্তা অবরোধ করে জিকির ও নামাজ আদায় করেন। তাদেরকে হটাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
ঢাকায় আটক ২২৬ : রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সকালে হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষ হয়। মোহাম্মদপুরে হরতাল সমর্থনকারীদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। পিকেটারদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলাকালে পল্টনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ ১২৫ জনকে আটক করে বলে ডিএমপি কন্ট্রোলরুম জানিয়েছে। তবে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা আহলুল্লাহ ওয়াসেল দাবি করেছেন, পল্টন, কামরাঙ্গীরচর, কাকরাইল, মোহাম্মদপুর, শাহবাগ, রমনাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ২২৬ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে পল্টন থানায় ১৩০ জন, রমনা থানায় ৩৫ জন, মিরপুর থানায় ১৩ জন, কাফরুল থানায় ৪ জন, শাহবাগ থানায় ২৮ জন, শাহ আলী থানায় ৮ জন, বনানী থানায় ১৮ জন, সাভারে ৫ জনসহ দেশের বিভিন্ন থানায় বাকিদের রাখা হয়েছে। এছাড়া আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে লালবাগ মাদ্রাসায় নিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
এদিকে পল্টন এলাকা থেকে ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামীকে পুলিশ আটক করলেও কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। নয়াপল্টনের মুসলিম লীগের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি তৈয়ব ও আমিনীর জামাতাসহ ৩৬ জনকে আটক করে পুলিশ। পুলিশি হামলায় আহত হন মুফতি তৈয়ব ও ঢাকা মহানগর আমির মাওলানা আবুল কাশেম। এছাড়াও মহাখালী, উত্তরা, খিলক্ষেত, আজমপুর, নিউমার্কেট, সাতমসজিদ রোড, খিলগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, প্রগতি সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করা হয়। মিছিলগুলোর সামনে-পেছনে ছিল কড়া পুলিশ পাহারা।
মোহাম্মদপুর : সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুর বাস টার্মিনালের কাছে জামেয়া রাহমানিয়া আরাবিয়াসহ বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে লাঠিচার্জ করে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে মাদ্রাসা ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বেধে যায়। পিকেটাররা পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের লাঠিপোটায় সেখানে ১০/১২ জন আহত হয় বলে জানা যায়।
শান্তিনগর-কাকরাইল : সকাল ৭টার দিকে শান্তিনগরস্থ আল্লা-রসুল মাদ্রাসার শতাধিক ছাত্র বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে মিছিলকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ ২৫ ছাত্রকে আটক করে। পরে মিছিলটি কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পাশ দিয়ে বেইলি রোডে এলে পুলিশ আবারও বাধা দেয়। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে আরও ২৫ ছাত্রকে আটক করে।
কাকরাইলে সকালে হরতালের সমর্থনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে পুলিশ বাধা দেয়। সেখান পুলিশি হামলায় ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি তৈয়ব, মহানগর আমির মাওলানা আবুল কাশেম ও কর্মী সোয়াইব আহমেদ আহত হন।
পল্টন ও বায়তুল মোকাররম : ভোর থেকেই ফকিরাপুল, পল্টন, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিলসহ পুরো এলাকা কর্ডন করে ফেলে পুলিশ। বেশ কয়েক দফা পিকেটাররা রাস্তায় নামলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। সকাল সোয়া ছয়টার দিকে পল্টনে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে পিকেটাররা জমায়েত হতে শুরু করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-সেদিক চলে যায়। পুলিশ এ সময় ওই স্থান থেকে ৯ যুবককে আটক করে।
সকাল ১০টার দিকে পল্টন মোড়ে হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। পুলিশ এ সময় ৯ জনকে আটক করে। আটককৃতদের মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামীও ছিলেন। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। জোহরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে হরতালের সমর্থনে সমাবেশ করা হয়। ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির লোকজন সেখান থেকে মিছিল করতে চাইলে কড়া পুলিশি পাহারায় তা সম্ভব হয়নি।
সকাল ৯টার দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে পুলিশ আরও তিনজনকে আটক করে। পুলিশের দাবি, তারা মিছিল শেষে মসজিদে ঢুকে আবার সমবেত হওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে আটককৃতরা জানান, তারা মসজিদে ঢুকে পরিস্থিতি দেখতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আটককৃতরা হলেন চাঁদপুর মতলবের নারায়ণপুর মাদ্রাসার ছাত্র মো. আবদুর রহমান (১৮), চট্টগ্রামের হাটহাজারী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ওমর ফারুক (১২), নারায়ণগঞ্জ দেওভোগ মাদ্রাসার দশম শ্রেণীর ছাত্র মো. শাহ পরান (১৬)।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পুরানা পল্টন কালভার্ট রোড এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করার জন্য কর্মীরা জড়ো হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এ সময় তারা দৌড়ে ছাত্র জমিয়ত কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়।
হাইকোর্ট-শাহবাগ এলাকা : হরতালের সমর্থনে দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে পুরনো ঢাকা থেকে একটি মিছিল হাইকোর্ট এলাকায় এলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ পিকেটারদের বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন ইসলামবাগ জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার ছাত্র নাজমুল আহসান। পরে পুলিশ তাকে আটক করে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করে।
শাহবাগে পিকেটিংয়ের সময়ে সকালে ২০ জনকে আটক করে শাহবাগ থানা হাজতে রাখা হয় বলে জানিয়েছেন শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার মহসিন।
মিরপুর গাবতলী : সকালে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করে পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদেরও দেখা গেছে। এখান থেকে পুলিশ ৭ জনকে আটক করে। মিরপুর গোলচক্কর এলাকায় সকালে অন্তত এক হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে মিছিল বের করে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা হঠাত্ করে হকিস্টিক ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
কল্যাণপুর : সকাল ৮টার দিকে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে ফুরফুরা শরীফের ২০/২৫ জন কর্মী সবগুলো বাস কাউন্টার বন্ধ করে দেয়। পরে তারা দারুস সালাম টাওয়ারের সামনে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে টায়ারে আগুন দেয়। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। শ্যামলী পরিবহনের মো. হাফিজ জানান, দূরপাল্লার বাস বন্ধ রয়েছে। গাবতলী থেকে আন্তঃজেলা কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।
পুরান ঢাকা : পুরান ঢাকার লালবাগ, আজিমপুর, কোতোয়ালি এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে গতকালের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। রাজধানীর চকবাজারের পাইকারি বাজার গতকাল বন্ধ ছিল। চকবাজারের পূর্ব পাশের মৌলভীবাজারেরও কোনো দোনপাট খোলেনি। সকালের দিকে ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনে এলেও পরে দোকানপাট না খুলেই চলে যান। এদিকে লালবাগ, আজিমপুর, সোয়ারীঘাট, মিটফোর্ড রোড, বাবুবাজার, নয়াবাজার, বংশাল, সদরঘাট, কাপ্তানবাজার এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট প্রায় বন্ধ ছিল। দু’একটি দোকানের শাটার খুললেও তারা পুরোপুরি দোকান খোলেনি। রাস্তায় চলতে দেখা গেছে সিএনজি স্কুটার। দু’একটি গাড়ি ছাড়া পুরান ঢাকায় প্রাইভেটকার রাস্তায় নামেনি। তবে রিকশা চলাচল ছিল স্বাভাবিক। সকাল থেকে চকবাজার টু গুলিস্তানের লেগুনা টেম্পোও চলাচল করতে দেখা যায়। তবে পুরান ঢাকার লালবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গিরচর এলাকা থেকে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির পৃথক পৃথক মিছিল বের হয়।
হাজারিবাগ কামরাঙ্গীরচর : সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাজারীবাগ এলাকা থেকে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি কিছু দূর যাওয়ার পরই পুলিশি বাধায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সকাল ১১টার দিকে কামরাঙ্গিরচরের আশ্রাফাবাদ এলাকা থেকে একটি বিশাল মিছিল বের হয়। মিছিলটি লালবাগের দিকে আসার সময় কামরাঙ্গিরচর ব্রিজের কাছে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। তখন মিছিলকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
যাত্রাবাড়ী : যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক ও ওলামা মাশায়েখরা সকাল থেকেই হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করে। তাদের সঙ্গে কয়েক দফা পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি মিছিল বের হলে পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় পিকেটাররা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে যাত্রাবাড়ীর জামিয়া আবু বক্কর মাদ্রাসার ছাত্র আবদুল খালেক গুরুতর আহত হন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। কোনো বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চলাচলও ছিল বন্ধ। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণা ছিল না বললেই চলে। ক্লাম রুমে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। তবে প্রশাসনিক ভবন খোলা থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অলস সময় কাটিয়েছেন।
এদিকে হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করেছে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ।
সানারপাড় সাইনবোর্ড শিমরাইল : হরতালের সমর্থনে সানারপাড়, সাইনবোর্ড ও শিমরাইল মোড় এলাকার বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক ও স্থানীয় ওলামা মাশায়েখগণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। তারা রাস্তার ওপর জিকির করে, নফল নামাজ পড়ে, সেজদা করে, মোনাজাত করে সড়ক অবরোধ করে রাখে। এ সময় বেশকিছু গাড়ি আটকা পড়ে। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ও র্যাব তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য অ্যাকশনে নামে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও পরিবহন শ্রমিক লীগের ক্যাডাররা। বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়াশেল নিক্ষেপ, রাবার বুলেট নিক্ষেপ ও শটগানের গুলি চালিয়ে অবরোধকারীদের সড়ক থেকে হটিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায় পুলিশ। পিকেটাররা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে পুলিশ পিছু হটে। আরো ফোর্স নিয়ে র্যাবসহ পুনরায় ওলামা মাশায়েখদের ওপর হামলা চালানো হয়। একের পর এক টিয়ারশেল নিক্ষেপ, রাবার বুলেট ও জলকামান ব্যবহার করেও হরতালকারীদের সড়ক থেকে হটাতে না পেরে হাল ছেড়ে দেয় পুলিশ। অবরোধকারীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এসময় তারা শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার ও সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের সঙ্গে পিকেটারদের ব্যাপক সংঘর্ষে পুলিশ, র্যাব ও সাংবাদিকসহ আহত হয়েছে শতাধিক ব্যক্তি। এদের মধ্যে বেশ ক’জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় অর্ধশত হরতাল সমর্থনকারী পিকেটারকে। ভোর ৬টা থেকে বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে আগত ছাত্ররা সড়ক অবরোধ করে।
সকাল ১১টায় আন্দোলনকারীরা কত সময় পর্যন্ত রাস্তায় অবস্থান করবে এ নিয়ে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষ জানায়, সাদি হুজুর, বশির উল্লাহ হুজুর ও আজাদ হুজুর নির্দেশ দিয়েছেন ১১টায় রাস্তার ওপর দোয়া করে সবাইকে যার যার মাদ্রাসায় চলে যাবার। কিন্তু অপরপক্ষ পিকেটারদের জানিয়ে দেয়, আমিনী হুজুর বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ অবরোধ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত সবাইকে রাস্তায় অবস্থান করার নির্দেশ দেন। ফলে হরতাল সমর্থনকারীরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আর এ সুযোগে আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী, অনাবিল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল বাবু তার পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ে পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে জলকামান নিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোতাহার হোসেনের নির্দেশে ডিএমপির উপ-কমিশনার গাজী মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে তিন দিক থেকে র্যাব ও পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর শটগানের গুলি, রাবার বুলেটসহ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় হাতে গজারি লাঠি ও রড নিয়ে যোগ দেয় আওয়ামী লীগের শতাধিক ক্যাডার। তারা রামদা, হকিস্টিক, লোহার রড ও লঠিসোটা নিয়ে অবরোধকারীদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে আন্দোলনকরীরা রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকান, আশপাশের বাড়ি ও মাদ্রাসায় আশ্রয় নেয়। ক্যাডাররা সেসব জায়গা থেকে তাদের ধরে এনে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দেয়। অবরোধকারীরা পুনরায় জড়ো হয়ে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখে। সংষর্ষে আহত হয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল ইব্রাহিম, রানা, এএসআই মালেক, মনির, বিপুল, র্যাব সদস্য মতিউর, সাংবাদিক মনির হোসেনসহ ৪ জন। আলী হোসাইন (হাতে ও পায়ে ৩টি গুলি), আব্দুল খালেক (মাথায় গুলিবিদ্ধ), জামিয়াতুল ইব্রাহিম ইসলামীয়া মাদ্রাসার ভিতরে চিকিত্সাধীন মাসুম, আব্দুল্লাহ আল মামুন, খালিদ, মানসুর, শিহাব উদ্দিনসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। দুপুর আড়াইটায় পুলিশ পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা হরতালবিরোধী মিছিল করে। এতে এলাকায় পুনরায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে পুলিশ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে যাত্রাবাড়ি, কদমতলী, ডেমরা, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নিয়ে যায়।
চট্টগ্রামে ব্যাপক সংঘর্ষ : চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে হরতালকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পুলিশের গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে হরতাল পালিত হয়েছে। এসময় আহত হয়েছে পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ তিন মাদ্রাসা ছাত্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হরতালকারীরা ভাংচুর করেছে প্রায় একশ’ যানবাহন। হরতালে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম। নগরী ও জেলার শতাধিক স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে পিকেটিং করেছে হরতাল সমর্থকরা। বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রামে এর আগে কোনো হরতালে এত বেশি স্থানে পিকেটিং হয়নি। নগরীর চাইতেও কড়া হরতাল হয়েছে জেলার ১৪টি উপজেলায়। এসব উপজেলার প্রধান সড়কগুলো ছাড়িয়ে গ্রামের অলিগলিতেও সক্রিয় ছিলেন হরতাল সমর্থকরা। চট্টগ্রামের সঙ্গে আন্তঃজেলা যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক ও চট্টগ্রাম-ক্সবাজার সড়কে ব্যারিকেডের কারণে যানবাহন চলাচল করেনি। চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে পণ্য লোডিং-আনলোডিং হলেও ট্রাক না চলায় খালাসকৃত পণ্য পরিবহন করা যায়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ট্রেনগুলো শিডিউল অনুযায়ী চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে। তবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী লাইনের একটি ট্রেন পটিয়ায় আটকে দেয় হরতালকারীরা।
নগরীতে ভোর ৬টা থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে হরতাল সমর্থকরা। সকাল থেকে তারা ওয়াসা মোড়, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, কর্ণফুলী ব্রিজ, কালামিয়া বাজার, ইপিজেড গেট, আন্দরকিল্লা, বহদ্দারহাট ও অক্সিজেন মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে কঠোর পুলিশ পাহারায় মিছিল সমাবেশ করে। এ কারণে নগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
হাটহাজারী : হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিভক্ত হয়ে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের অন্তত ১০টি স্থানে অবরোধ করে। অবরোধের কারণে ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবারের ওরস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ২ শতাধিক বাস সকাল থেকে নগরীর অক্সিজেন বালুচরা এলাকা থেকে হাটহাজারী পর্যন্ত এলাকায় আটকা পড়ে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশের সহায়তায় এসব গাড়ি গন্তব্যের উদ্দেশে যেতে চাইলে পিকেটাররা বাধা দেয়। এ সময় তারা বেশ কিছু গাড়ি ভাংচুর করলে পুলিশ এবং গাড়ির যাত্রীরা মিলে পিকেটারদের ধাওয়া করে এবং তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষ অক্সিজেন, বায়েজিদ, বালুচরা এলাকার কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। সংঘর্ষ চলাকালে হরতাল সমর্থকরা অক্সিজেন এলাকার শিউলী পেট্রোল পাম্প ভাংচুর এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। নগরীর অক্সিজেন মোড় থেকে হাটহাজারী মাদ্রাসা পর্যন্ত এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন। বালুচরা এলাকায় পুলিশ গুলি চালায়। এতে কয়েকজন পিকেটার গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পুলিশের গুলিতে আহত নাদেরুজ্জামান (২২) ও ইউসুফ (১৮) নামক দুই মাদ্রাসা ছাত্রকে হাটহাজারী স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং জুয়েল নামে একজনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। বালুচরা এলাকায় আহত পুলিশ কনস্টেবল রফিককে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কে বড়দীঘির পাড় এলাকায় পিকেটারদের সঙ্গে মাইজভাণ্ডারী ভক্তদের সংঘর্ষে ২৫ জন আহত হয়েছে। ভাংচুর হয়েছে প্রায় ৫০টি গাড়ি। চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেল লাইনে পিকেটাররা একটি ট্রেনের বগি ভাংচুর করেছে।
পটিয়া : দক্ষিণ চট্টগ্রামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়। হরতালে সাবেক মহকুমা শহর পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে। ফজরের নামাজের পর পরই পটিয়া আল জামেয়া আল ইসলামিয়ার (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়) হাজার হাজার শিক্ষার্থী পটিয়ার রাজপথে নেমে আসে। তাদের সঙ্গে আরাকান সড়কে নেমে আসে চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগড়ার শত শত মাদ্রাসা ছাত্র ও শিক্ষক। রাস্তায় জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভড়কে যায়। তারা পিকেটারদের এড়িয়ে চলতে থাকে। অন্যান্য হরতালের মতো রাস্তায় র্যাব ও পুলিশকে দেখা যায়নি। পটিয়া কলেজ বাজার, ফকিরনীর হাট, শান্তির হাট, মুজাফ্ফরাবাদ, চন্দনাইশের দোহাজারীতে পিকেটিং করে কয়েকশ’ মাদ্রাসা ছাত্র।
সাতকানিয়া : পুলিশের সঙ্গে পিকেটারদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্য দিয়ে হরতাল পালিত হয়েছে। পিকেটারদের হামলায় জমির নামের লোহাগাড়া থানার এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। ভাংচুর হয়েছে পুলিশের একটি গাড়িও। তবে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার ঠাকুরদীঘি বাজারে অবস্থান নেয়া কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা সারাদিনই পিকেটিং করে।
রাঙ্গুনিয়া : রাঙ্গুনিয়ায় কাপ্তাই-চট্টগ্রাম, চৌমুহনী-রানীরহাটসহ বিভিন্ন সড়কে অবরোধ করে পিকেটাররা। তাদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে।
খুলনায় আহত অর্ধশত, আটক ৪ : পুলিশের লাঠিচার্জ, ভাংচুর, আহতসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে গতকাল খুলনায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে পিকেটিং করার সময় নগরীর শিববাড়ি মোড়, পিটিআই মোড়, পশ্চিম রূপসা ঘাট এলাকায় পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। পুলিশ বিভিন্ন এলাকা থেকে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি ও খেলাফত মজলিসের খুলনা মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা নাসিরউদ্দিনসহ ১০ জনকে আটক করে। হরতাল চলাকালে সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি।
সকাল সাড়ে ৭টায় পশ্চিম রূপসা ট্রাফিক মোড়ে পিকেটিং করার সময় পুলিশের সঙ্গে পিকেটারদের ধস্তাধস্তি হয় এবং কয়েকটি স্কুটার ভাংচুর করা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নারায়ণগঞ্জ : গতকাল ভোর থেকে হরতাল সমর্থনকারী পিকেটাররা শহর ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব এলাকায় অবস্থান নেয়। তারা লাঠি, লোহার রড নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। তাদের পিকেটিংয়ের কারণে যানবাহন চলাচল ও দোকানপাট ছিল বন্ধ। বেলা যত গড়াতে থাকে রাস্তায় পিকেটারদের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে। পিকেটাররা রাস্তায়ই সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে। শহরে মাঝে মধ্যে পুলিশ হরতালকারীদের দিকে এগুবার চেষ্টা করামাত্রই পিকেটাররা লাঠিসোটা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে অবশেষে মূল শহরে পুলিশ অ্যাকশনে যায়নি। ফতুল্লা থানার পাগলা এলাকায় হরতাল সমর্থনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে হরতাল পালিত হয়েছে।
সোনারগাঁও : হরতাল সমর্থকরা বেশ কয়েক দফা রাস্তা অবরোধ করলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তাদের তুলে দেয়। এ সময় কয়েক দফায় মৃদু সংঘর্ষ হয়েছে।
সিলেটে সর্বাত্মক হরতাল : সিলেটে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে। নগরজুড়ে ওলামা মাশায়েখদের খণ্ড খণ্ড মিছিল থেকে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার ধ্বনির গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো শহর। শহর থেকে কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি। নগরীতে দু’একটি রিকশা চললেও বাস-ট্রাক চলেনি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ছাত্র জমিয়ত, খেলাফত মজলিস, ছাত্র মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি শহরে মিছিল করে। ইসলাম আইন বাস্তবায়ন কমিটি সিলেটে জরুরি সভা করে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইনের তীব্র প্রতিবাদ জানান। এতে প্রখ্যাত ওলামা মাশায়েখরা বক্তব্য রাখেন। এছাড়া জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, বিশ্বনাথেও নজিরবিহীনভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালের সমর্থনে উপজেলায়গুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।
মৌলভীবাজারে আহত ১২ : মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শ্রীমঙ্গল রোডের ভৈরব-বাজার এলাকায় শেখবাড়ি জামেয়া মাদেনিয়া কাওমিয়া মাদ্রাসার ছাত্র, স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের মধ্যে এক সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ ১২ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে।
ফেনী : ফেনীতে হরতাল চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবরোধ করে। এ সময় পিকেটাররা বাস, সিএনজি অটোরিকশাসহ ৭টি পরিবহন ভাংচুর করেছে। সকাল থেকে শহরে পুলিশের বাধার মধ্যেও বিক্ষিপ্তভাবে পিকেটাররা পিকেটিং করেছে। মহাসড়কে দূরপাল্লার কোনো বাস চলাচল করেনি। রেল চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
মানিকগঞ্জ : শহরে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে ও কাফনের কাপড় পরে পিকেটাররা বিক্ষোভ করেছে।
চুয়াডাঙ্গায় পুলিশের বাধা : হরতাল চলাকালে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। দোকানপাট ছিল বন্ধ। জেলার সরকারি বেসরকারি কার্যালয় ও ব্যাংক বীমা খোলা থাকলেও উপস্থিতি ছিল কম। অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় শহরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা সাড়ে ১১টায় হরতালের সমর্থনে জেলা বিএনপির সভাপতি অহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের নেতৃত্বে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা পিকেটিং ও মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
রাউজানে ব্যাপক সংঘর্ষ, আহত অর্ধশত : হরতাল চলাকালে চট্টগ্রামের রাউজানের বিভিন্ন স্থানে হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে অর্ধশতাধিকের বেশি আহত হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
আশুগঞ্জে কাফনের কাপড় পরে মিছিল : মুফতি আমিনীর নির্বাচনী এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও সরাইল উপজেলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। ভোর ৬টা থেকে কাফনের কাপড় পরে সহস্রাধিক ওলামা-মাশায়েখ উপজেলার রেল গেট এলাকায় অবস্থান নেয়। এতে করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুপুর ২টা পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন বন্ধ ছিল। উপজেলার ২টি লঞ্চঘাট থেকে ৬টি নৌ-রুটে কোনো লঞ্চ ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। সকাল-সন্ধ্যা বন্ধ থাকে নদীবন্দরের সব কার্যক্রম। অর্ধদিবস ট্রেন চলাচলও বন্ধ ছিল।
সাভারে হরতালকালে বিক্ষোভ সমাবেশ : হরতালে পিকেটিং করার অভিযোগে পুলিশ ৫ মুসল্লিকে আটক করে। সকাল ১০টায় সর্বস্তরের মুসলিম জনতার ব্যানারে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে রাজ্জাক প্লাজার সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কাঁচাবাজার প্রদক্ষিণ শেষে মনসুর মার্কেটের সামনে গিয়ে পথসভায় মিলিত হয়। হরতাল চলাকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করেনি। আটককৃত ৫ পিকেটারকে পুলিশ সন্ধ্যায় ছেড়ে দিয়েছে।http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/04/05/75480

আটকে গেছে ফ্রি ট্রানজিটের ট্রেইলার : বাংলাদেশের বুকচিরে বিনাশুল্কে ট্রানজিট কার্যকর করল সরকার












আলাউদ্দিন আরিফ ও সাদেকুল ইসলাম সাচ্চু
বাংলাদেশের বুকচিরে সড়কপথে ভারতের জন্য ফ্রি ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর করা হয়েছে। রোববার মধ্যরাতের পর ভারতীয় বিদ্যুেকন্দ্রের সরঞ্জামবাহী ৩২৬ টন ভারী ৪টি ট্রেইলার আশুগঞ্জ থেকে সড়কপথে ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা দিয়ে কিছুদূর গিয়েই ঘটে বিপত্তি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে রাস্তায়ই একটি ভাসমান বিকল্প সেতুর ওপর আটকে যায় বিদ্যুেকন্দ্রের ভারী সরঞ্জামবাহী বৃহদাকার প্রথম ট্রেইলারটি। আটকা পড়ে বাকি ৩টি ট্রেইলারও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কাউতলী এলাকায় তিতাসের শাখা নদী কুরুলিয়া বা এন্ডারসন খাল পার হওয়ার সময় সোমবার ভোর রাত ৪টার দিকে ঘটে এ বিপত্তি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ট্রেইলারগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে পারেনি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীরা জানান, সড়ক মেরামত সম্পন্ন হলে মধ্যরাতে ট্রেইলারগুলোর আবার রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রেইলারগুলো রাস্তায় আটকে পড়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভারী পণ্য বোঝাই এসব ট্রেইলার সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্টগুলোর স্থায়িত্ব নষ্ট করে দেবে। ট্রেইলারগুলো যাওয়ার সময় আরও ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিঘ্নিত হবে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আশুগঞ্জ নৌবন্দরের ডিপো থেকে পলাটানা বিদ্যুেকন্দ্রের মালামাল নিয়ে রোববার দিবাগত রাত সোয়া ১২টায় ট্রেইলারগুলো ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা হয়। রাত ৪টার দিকে ট্রেইলারগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কাউতলী এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে তিতাসের শাখা নদী এন্ডারসন খাল যা স্থানীয়ভাবে কুরুলিয়া খাল নামে পরিচিত ও ৮০ মিটার চওড়া নদীর ওপর থাকা ব্রিজটি দুর্বল হওয়ায় আগেই ব্রিজের পাশে বাইপাস হিসেবে বার্জ (থেমে থাকা ফেরি) স্থাপন করা হয়। ভোর চারটার দিকে প্রথম ট্রেইলারটি (নম্বর এইচ আর-৫৫ এল-২৭৯৬) ওপরে ওঠামাত্রই বার্জটি কাত হয়ে পড়ে।
ট্রেইলারের সহযোগী চালক রাজ কুমার শর্মা জানান, নদীর ওপর বসানো ভাসমান ফেরি বা বার্জের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সামনের অংশ পার হওয়ার পরই সড়কের মাটি দেবে যাচ্ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে তাত্ক্ষণিকভাবে ট্রেইলারটি পেছনে নেয়া হয়েছে। গতকাল সারাদিনই প্রথম ট্রেইলারটি বার্জের ওপর ছিল।
আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, আশুগঞ্জ নৌবন্দরের অদূরে সোনারামপুর ডিপো থেকে ট্রেইলার ৪টি রাজস্ব বিভাগের ছাড়পত্র নিয়ে সোমবার রাত ১২টা ১৫ মিনিটে একযোগে ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা হয়। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ার সময় ত্রিপুরা পাওয়ার কোম্পানির পরিচালক আর কে মোদন, এবিসি ইন্ডিয়া লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী বি কে ধর, সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জাফর ও কাস্টমসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মালবাহী ট্রেইলার ৪টি ডিপো থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ওঠার পর পেছনের দিক থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী কোনো যানবাহন সেগুলো অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে ট্রেইলারগুলোর পেছনে আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত পণ্য বোঝাই ট্রাকসহ কয়েকশ’ যানবাহন আটকা পড়ে।
মালামাল পরিবহনের ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবিসি কোম্পানির কর্মী আলী হায়দার সাংবাদিকদের বলেন, খালের পানি কমে যাওয়ায় বার্জের সঙ্গে স্থাপিত পন্টুন সড়কের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে। তাই ট্রেইলারগুলো চলাচল করতে পারছে না। তিনি আরও জানান, নদীর ওপর থাকা সেতুর ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় পন্টুন বসিয়ে তার সঙ্গে সংযোগ সড়ক তৈরি করে ট্রেইলারগুলোর চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জোয়ারে পানি বাড়লে গত রাত ১২টার দিকে ট্রেইলারগুলো ছাড়ার কথা জানান তিনি।
সড়ক ও জনপথ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জোয়ার-ভাটার কারণে ফেরিটি সমন্বয় হচ্ছিল না। সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কোম্পানির লোকজন সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দাবি, ভারতীয় ট্রেইলার চলাচলের সময় বাংলাদেশী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সওজের বি-বাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী যানবাহন চালাচল স্বাভাবিকের দাবি করলেও তার প্রতিষ্ঠানই বলছে ভিন্নকথা। রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ভারী যন্ত্রাংশ বোঝাই কার্গো (ট্রেইলার) চলাচলকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়ার সেনারবাদী পর্যন্ত সড়কে বিভিন্ন যানবাহন চলাচল সীমিত অথবা বন্ধ থাকবে।
উল্লেখ্য, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানায় বিদ্যুত্-কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ‘ওভার ডাইমেনশনাল কার্গো’ বা ওডিসির আওতায় (শুল্ক ছাড়া) কমপক্ষে ৮৬ জাহাজ পণ্য আসছে। এর মধ্যে ৫টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত ৯ মার্চ ভারতীয় এবিসি কোম্পানির একটি জাহাজ ১৪০ টন ওজনের বিশাল ২টি ‘টারবাইন’ নিয়ে কলকাতা থেকে আশুগঞ্জে আসে। এমভি সাইকা নামের জাহাজটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি কলকাতার খিদিরপুর নৌবন্দর ছেড়ে আসে। পরবর্তীতে ১২ মার্চ এমভি মোস্তাদির-২ ও এমভি সোনালী ১৬ মার্চ, এমভি হেংগিং-২ নামের অপর একটি জাহাজ ২০ মার্চ ও আরও একটি জাহাজ ২৪ মার্চ আশুগঞ্জ নৌবন্দরে পণ্য খালাস করে।
গত বছরের ৩১ মে আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে কলকাতা থেকে আগরতলায় পণ্য পরিবহনের চুক্তি করে বাংলাদেশ। গত বছরের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের যৌথ ইশতেহারের আলোকে বাংলাদেশ সরকার মে মাসে আশুগঞ্জকে পঞ্চম বন্দর ঘোষণা করে। আশুগঞ্জে আন্তঃমহাদেশীয় ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্র চালুর ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকার ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (আইডব্লিউটিটি) চুক্তিতে এক সংযোজনীর মাধ্যমে আশুগঞ্জ দিয়ে ত্রিপুরায় ভারতীয় কার্গো ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমোদন দিয়ে আশুগঞ্জকে দ্বিতীয় ট্রানশিপমেন্ট পয়েন্ট ঘোষণা করে।
ভারতীয় পণ্যবোঝাই ট্রেইলার চলাচলকে সড়ক অবকাঠামোর ক্ষতি ও স্বাধীনতা-সার্বভৌত্বকে উপেক্ষার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও বড় ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেজ্ঞরা। ভারতের এই পণ্য পরিবহনকে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ববিরোধী আখ্যা দিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান বলেন, সড়ক অবকাঠামোর ভয়াবহ ক্ষতির পাশাপাশি বিষয়টি আমাদের নিরাপত্তার জন্য যে বড় হুমকি, সেটা বার বার বলার পরও সরকার কানে নিচ্ছে না। এই ট্রানজিট কার্যকর করার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চাইছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাহবুব উল্লাহ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বহুদিন থেকেই বলে আসছি, বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো এ ধরনের ট্রেইলার চলাচলের উপযোগী নয়। এ ধরনের বড় বড় ট্রেইলার চলার উপযোগী সড়ক অবকাঠামো তৈরিতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। যার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। ভারী সরঞ্জাম বোঝাই এসব ট্রেইলার চলাচল আমাদের সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে। সরকার ভারতের প্রতি এতটাই নতজানু যে, ন্যূনতম শুল্ক আদায় না করেই ট্রান্সশিপমেন্টের নামে ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সবকিছু উপেক্ষা করে ভারতকে এই ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে সরকার। এটা দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, এর বিপরীতে আমরা ভারত থেকে যেসব কঠিন শর্তে ঋণ নিয়েছি সেটা তুলনা করলেই নতজানু নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়
।

তিন ঘণ্টা বঙ্গবন্ধুর জীবনী পাঠ : বুড়িচংয়ে প্রখর রোদে শিক্ষিকাসহ ৫০ ছাত্রী অজ্ঞান

বুড়িচং (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

কুমিল্লার বুড়িচংয়ের একটি হাইস্কুলে অ্যাসেম্বলি চলাকালীন শাস্তির ভয় দেখিয়ে জোড় করে দাঁড় করিয়ে ৩ ঘণ্টা বঙ্গবন্ধুর জীবনী শোনানোর সময় প্রখর রোদে শিক্ষিকাসহ অর্ধশতাধিক ছাত্রী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মারাত্মক আহত ছাত্রীদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ছাত্রীদের আর্তচিত্কারে অবস্থা বেগতিক দেখে বক্তা আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়াল টপকিয়ে স্কুল থেকে পালিয়ে যান। ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার তাহেরা জুনাব আলী বালিকা বিদ্যালয়ে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল ১০টায় উপজেলার বিদ্যালয় মাঠে অ্যাসেম্বলি চলাকালীন প্রখর রোদে বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল ওয়াহাব মাস্টার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রমিজ উদ্দিন মাস্টার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীর ওপর বক্তৃতা করার সময় ১০ ছাত্রী অসুস্থ হয়। তারা মাঠ ছেড়ে ক্লাসরুমে যাওয়ার কথা বললে শিক্ষকরা শাস্তির ভয় দেখিয়ে বক্তব্য শুনতে বাধ্য করে। পরে একে একে শিক্ষিকাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্রী জ্ঞান হারিয়ে মাঠে লুটে পড়েন। এ অবস্থা দেখে ওই আওয়ামী নেতারা স্কুলের পেছনের ওয়াল টপকিয়ে পালিয়ে যায়। অন্যান্য ছাত্রীদের চিত্কারে স্কুলের আশপাশের লোকজন ছাত্রীদের উদ্ধার করতে এসে দেখে স্কুলের মূল ফটক তালাবদ্ধ। এলাকাবাসী এসে তালা ভেঙে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের মনিপুর ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করেন।
স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী রুমি, জান্নাতুল কোবরা, ফাতেমা আক্তার, আফরোজা আক্তার, ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী তানজিনা আক্তার এবং শিক্ষিকা জেসমিন আক্তারসহ প্রায় ৩০ জনকে হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হয়। হাসাপাতালে সাংবাদিকদের তারা জানান, স্কুলে অ্যাসেম্বলি চলাকালীন শাস্তির ভয় দেখিয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা বঙ্গবন্ধুর জীবনী তাদের শোনানোর সময় তারা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অভিভাবক আবদুল কুদ্দুস, আবদুল খালেক জানান, কোমলমতি মেয়েদের প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
এ ব্যাপারে বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল ওহাব মাস্টারের বক্তব্য নেয়ার জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

Tuesday, 12 April 2011

শেয়ারবাজার আওয়ামী লীগ আমলে তলাবিহীন ঝুড়ি : আবারও একদিনে ৪৬০ পয়েন্ট পতন হয়েছে সূচকের










জাহেদ চৌধুরী
আওয়ামী লীগ সরকারে এলেই শেয়ারবাজার হয়ে পড়ে তলাবিহীন ঝুড়ি। সাধারণ মানুষের পকেট কাটার হাতিয়ারে পরিণত হয় এই পুঁজিবাজার। নানা প্রলোভন দেখিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করে একপর্যায়ে সাধারণ মানুষের পুঁজি হাতিয়ে নিয়ে কেটে পড়ে বিশেষ সিন্ডিকেট। এরপর চলে সরকারি কোষাগারে রাখা জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ। আইসিবি ও বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বাজার সাপোর্টের নামে সরকারি টাকা ঢালা হয় বাজারে। একসময় দেখা যায় সে টাকাও কোনো কাজে আসে না। জনগণেরই করের টাকা চলে যায় ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণ গহ্বরে। এর মাধ্যমে জুয়াড়ি সিন্ডিকেট বরং দফায় দফায় এভাবে শেয়ার মার্কেট থেকে জনগণের টাকা লুটে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হয়ে পড়েন দেউলিয়া। শেয়ারবাজারের মাধ্যমে প্রায় জনগণের সরাসরি পকেট কাটা শেষ হয়েছে। এখন দফায় দফায় সরকারি টাকা ঢালা হচ্ছে। সময়মত সঠিক পদক্ষেপ না নেয়ায় জনগণের ট্যাক্সের টাকাও কোনো কাজে আসছে না। গতকাল একদিনেই প্রায় ৪৬০ পয়েন্ট সূচকের পতন হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। ২৫৫টি কোম্পানির ট্রেডিং হয়েছে। এর মধ্যে দাম কমেছে ২৪৫টির। এর অধিকাংশই নিচের সার্কিটব্রেকারে গিয়ে ঠেকেছে। গতকাল একদিনে ডিএসইতে গড় দরপতন প্রায় ৭ শতাংশ। তবে এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে ১০ শতাংশ করে।
শেয়ারবাজারে অতিমূল্যায়িত শেয়ারের ব্যাপারে যখন সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন ছিল, তখন এ নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। সরকার বরং অর্থনীতির ইতিবাচক দিক বলে বাহাবা নেয়ার চেষ্টা করেছে এবং সাধারণ জনগণকে অতিমূল্যায়িত বাজারে বিনিয়োগে উস্কে দিয়েছে।
কেউ এ নিয়ে কথা বললে ভিন্ন চোখে সেটাকে দেখা হয়েছে। গত মে মাসে বাজার যখন তুঙ্গে, তখন আমার দেশ-এর প্রথম পাতায় ৩ কলাম শিরোনামে পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এ নিয়ে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। দেশের অর্থনীতি নিয়ে লেখা ওই মন্তব্য প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ ছিল শেয়ারবাজার নিয়ে। ৩০ মে আমার দেশ-এ প্রকাশিত মাহমুদুর রহমানের ওই মন্তব্য প্রতিবেদনে তিনি শেয়ারবাজার নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু পরদিনই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল। তখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক ৩৬শ’ পয়েন্ট থেকে কমে একপর্যায়ে মাত্র ৬শ’ পয়েন্টে ঠেকেছিল। ৭ দিনে সূচকের পতন ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এবারও গত ডিসেম্বরের শুরু থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাবে দেখা গেছে সূচক কমেছে ৩ হাজার ৭১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। শতকরা হিসাবে ৪০ ভাগের বেশি। ৫ ডিসেম্বর যেখানে সূচক ছিল ৮ হাজার ৯১৮ দশমিক ৫১, সেখানে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় কমে গিয়ে সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ২০৩ দশমিক ৪৩ ভাগ। এরপর সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবি এবং সোনালী, জনতা, রূপালী, অগ্রণী ব্যাংক, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ফান্ড গঠনের ঘোষণা দিলে গত সপ্তাহে শেয়ারবাজার কিছুটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সূচকও ৬ কার্যদিবসে ১৪শ’ পয়েন্ট বেড়ে গত বৃহস্পতিবার দাঁড়িয়েছিল ৬ হাজার ৬৩৯ দশমিক ১৮ পয়েন্ট। কিন্তু গতকাল একদিনেই ডিএসইতে সূচকের পতন হয়েছে ৪৫৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। কমেছে প্রায় সব শেয়ারের দাম। ৫ ডিসেম্বর যেখানে বাজার মূলধন পৌঁছেছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭১ কোটি টাকা; সেখানে এই মূলধন ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৪ কোটি ১২ লাখ টাকা কমে গিয়ে গত মাসের শেষদিনে পৌঁছেছিল ২ লাখ ৪১ হাজার ৩০৭ কোটি ২৯ লাখ টাকায়। গত ক’দিনে কিছুটা বেড়ে গতকাল দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। শেয়ারবাজার থেকে কম-বেশি ১ লাখ কোটি টাকার মূলধন উধাও হয়ে গেছে। তার বড় একটি অংশই একটি সিন্ডিকেট লুটে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
’৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত কমিটি হয়েছিল। সে কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এখনও জনসমক্ষে আসেনি। তখন এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছিল। সে মামলাও ঝুলে আছে। তখন সরকারি দলের লোকজন জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। তখনকার অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি শেয়ারবাজার বোঝেন না। আর এবার শেয়ারবাজারে ধস নামার পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, শেয়ারবাজার ধসের পেছনে তার ও সিএসই’র সিদ্ধান্তে বেশকিছু ভুল ছিল, সেগুলো তিনি শোধরানোর চেষ্টা করছেন। কিছুদিন আগে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন শেয়ারবাজার তিনি বোঝেন না। প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী স্বীকারোক্তি দিলেও জনগণের পকেট কেটে যে টাকা তাদের ভুল সিদ্ধান্ত বা দুর্বলতার কারণে লুট হয়েছে, তার দায় তারা কীভাবে এড়াবেন—এ প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের পকেট কাটার পর দফায় দফায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের ট্যাক্সের টাকা আইসিবিসহ শেয়ারবাজারে ঢালার পর কিছুই বাস্কেটে থাকছে না। এজন্য শেয়ারবাজার এখন তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
অথচ শেয়ারবাজারের সূচক যখন ধাই ধাই করে ওপরের দিকে উঠছিল, তখন বার বার সরকারকে সতর্ক করে দেয়ার পরও এ নিয়ে তারা কোনো গরজ দেখায়নি। বরং বার বারই বলা হয়েছে—এটা দেশের অর্থনীতিতে ভালো লক্ষণ।
শেয়ারবাজার নিয়ে মাহমুদুর রহমান আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন : গত ১ জুন রাতে আমার দেশ কার্যালয় থেকে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। মাত্র একদিন আগে ৩০ মে ‘টাকার পাহাড় যাচ্ছে কোথায়’ শিরোনামে মাহমুদুর রহমান আমার দেশ-এ প্রকাশিত তার মন্তব্য প্রতিবেদনের একটি প্যারায় উল্লেখ করেছিলেন—‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও একটি বৈপরীত্য এখন ক্রিয়াশীল রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ সাল থেকেই শিল্পখাতে মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে শেয়ারবাজারে দর ও মূলধন বৃদ্ধির এক অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতা চলছে। ১৯৯৬ সালে শেয়ার কেলেঙ্কারির সময় মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬০০ পয়েন্ট স্পর্শ করেছিল। আর এখন সেটি ৬ হাজার অতিক্রম করেছে। প্রতিদিনের লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। বছরে ২২৫ দিন শেয়ার মার্কেট খোলা থাকলে কেবল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেই বার্ষিক লেনদেন এখন ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। শেয়ার কেনাবেচায় বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে হয়তো এবছরের মধ্যেই টাকার অংকে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ আমাদের মোট জাতীয় আয়কে অতিক্রম করবে, যা বর্তমানে ৬ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। আমার বিবেচনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের শেয়ারবাজারে এখন যা চলছে, তাকে স্রেফ জুয়া ছাড়া আর কোনো নামে ডাকার উপায় নেই। ফটকাবাজ গোষ্ঠীর কারসাজিতে সৃষ্ট এই বিশালকায় বেলুন ফুটো হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ মাহমুদুর রহমান আরও মন্তব্য করেছিলেন—‘এই বেলুন যখন ফুটো হবে, তখন অসংখ্য দেউলিয়া মনুষের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেউলিয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানও দেখা যাবে।’
তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে মাহমুদুর রহমান যে মন্তব্যটি করেছিলেন, সেটি ছিল—‘চোখের সামনে অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি অগ্রহণযোগ্য কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, অথচ আমাদের সব ধীমান অর্থনীতিবিদরা নীরব।’
মাহমুদুর রহমানের আগাম সতর্কবার্তা এরই মধ্যে সত্যে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তার এ সতর্ক বার্তাকে সময়মত আমলে নিলে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির দায় থেকে সরকার রক্ষা পেত। দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীও তাদের সর্বস্ব হারানো থেকে রক্ষা পেতেন।
লাখো-কোটি টাকার মূলধন উধাও : মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বা ডিএসই থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার মূলধন উধাও হওয়ার পর সরকারি ব্যাংক ও আইসিবিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের ট্যাক্সের টাকা শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের কয়েকটি চেষ্টাও সফল হয়নি। টাকা ঢালার পর সূচক কিছুটা বাড়ছে; আবার সপ্তাহ না ঘুরতেই সূচক পড়ে যাচ্ছে। গত ৩ মাসে অন্তত ৭ বার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রতিবারই আইসিবির মাধ্যমে কিছু শেয়ার কিনেছে সরকার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
সর্বশেষ সরকারি পুঁজিবাজারের বিদ্যমান সঙ্কট কাটাতে বাংলাদেশ ফান্ড নামে একটি ওপেন অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয় সরকারি উদ্যোগে। ফান্ডের প্রাথমিক আকার ধরা হয় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে পরিবর্তিত এ ফান্ডের আকার বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সম্প্রতি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) কার্যালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ৩ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে এ ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফায়েকুজ্জামান। আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন জনতা, সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ব্যাংক, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেই এই ফান্ড গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। ফান্ডের মোট আকারের ৫০ শতাংশ মানি মার্কেটে এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। যেহেতু এটি একটি আপদকালীন ফান্ড, তাই সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে ফান্ড পরিচালনায় আলাদা সুযোগ দিতে হবে।
একদিনেই ডিএসই সূচক কমেছে ৪৬০ পয়েন্ট : অর্থনৈতিক রিপোর্টার জানান, বড় ধরনের দরপতন দিয়েই শুরু হয়েছে এ সপ্তাহের শেয়ারবাজারের লেনদেন। গতকাল একদিনেই দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচকের পতন হয়েছে ৪৫৯ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট। দিনশেষে ডিএসইর সাধারণ সূচক গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৭৯ পয়েন্টে। লেনদেনে অংশ নেয়া প্রায় সব কয়টি কোম্পানির শেয়ারের বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। লেনদেনকৃত ২৫৫টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ১০টির। বাকি ২৪৫টি কোম্পানিরই শেয়ারের বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এর আগে টানা ৬ দিন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরবৃদ্ধির ঘটনা ঘটে।
বাজার বিশ্লেষকরা জানান, টানা দরবৃদ্ধির পর বাজারে মূল্য সংশোধন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে যেভাবে বাজারে দরবৃদ্ধি এবং দরপতন হচ্ছে তা স্বাভাবিক নয়। তারা বলেন, যখন দর বাড়ে তখন প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ে আবার যখন পতন হয় তখন প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের দরপতন হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির মৌলভিত্তি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গতকাল সূচকের পতন দিয়ে শুরু হয় দিনের লেনদেন। কিন্তু পরবর্তী ১০ মিনিট সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হলেও তা খুব একটা স্থাযী হয়নি। ফের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। শেয়ারের দর কমতে থাকায় আরও পতন হবে, এমন আশঙ্কায় শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। এছাড়া ৬ দিন টানা দরবৃদ্ধির কারণে গতকাল মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতাও ছিল বেশি। ফলে দুইবাবেই শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় অধিকাংশ কোম্পানিই দর হারায়। তবে একদিনে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর হারানো কিংবা দরপতনের ঘটনা বাজারের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এ ধরনের প্রবণতা বাজারকে আবারও অস্থির করে তুলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস ফার্স্ট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াওয়ার সাঈদ বলেন, যখন দাম বাড়ছে তখন দেখা যাচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে। আবার যখন দর কমছে তখন ভালো মৌলভিত্তির এবং ক্রয়ানুকূলে রয়েছে এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারেরও দর কমছে। বিনিয়োগকারীরা হুজুগে শেয়ার কিনছেন বা বিক্রি করছেন কিন্তু কোম্পানির মৌলভিত্তি বিবেচনা করছেন না। এ ধরনের ঘটনা বাজারের জন্য ইতিবাচক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে গতকাল দরপতনের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার শেয়ার।
মার্চেন্ট ব্যাংকার বৃদ্ধির চিন্তা করছে সরকার : অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সংসদে বলেছেন, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা এবং পুঁজি তারল্য বাড়ানোর জন্য সরকার মার্চেন্ট ব্যাংকার আরও বৃদ্ধির চিন্তা-ভাবনা করছে। কার্যদিবস শুরুর পর টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ কথা জানান। মন্ত্রী জানান, পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সরাসরি বিনিয়োগের ব্যাপারে সরকার কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করেনি। তিনি জানান, চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে শেয়ারবাজারে মূল্য নিরূপিত হয়। সমপ্রতি শেয়ারের চাহিদা যোগানের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই বাজারের মূল্য সংশোধনের অংশ হিসাবে শেয়ারের দরপতন হয়। তবে সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে শিগগিরই বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যায়। অর্থমন্ত্রী জানান, বাজার উত্থান-পতনের বিষয়টি তদন্ত করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনে যদি সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি জানান, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর আরও শেয়ার দ্রুত পুঁজিবাজারে ছাড়ার ব্যাপারে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। আশা করা যায়- সরকারি কোম্পানির শেয়ার অচিরেই বাজারে আসবে।
‘বাংলাদেশ ফান্ড’ গঠনে কোনো অনিশ্চয়তা নেই : আইসিবি : এদিকে গতকালের দরপতনের পেছনে একটি বার্তা সংস্থা পরিবেশিত প্রতিবেদনকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ফান্ড গঠনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলা হয়। তবে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফায়েকুজ্জামান গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, ‘বাংলাদেশ ফান্ড’ গঠনের বিষয়ে কোনো রকম সংশয় নেই। তিনি বলেন, মেয়াদহীন (ওপেন এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী উদ্যোক্তা অংশের অর্থ নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তহবিলের কার্যক্রম শুরু হবে। এরই মধ্যে আইসিবির পরিচালনা পর্ষদ এই ফান্ড গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে ফান্ডের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পরে আইসিবির পক্ষ থেকে সহযোগী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ সপ্তাহের মধ্যেই সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। ফলে পুরো বিষয়টিই খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
ডিএসইর ওয়েবসাইট বিভ্রাট : এদিকে গতকাল লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টা পর ডিএসইর ওয়েবসাইটে বড় ধরনের বিভ্রাট তৈরি হয়। বেলা ১২টার পর থেকে সোয়া একটা পর্যন্ত ডিএসইর ওয়েবসাইটটি কাজ করছিল না। এতে অনেক বিনিয়োগকারী নানা ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসইর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা খায়রুজ্জামান বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে ডিএসইর ওয়েবসাইট বন্ধ থাকে। লেনদেনের সঙ্গে ওয়েবসাইটের কোনো সম্পর্ক নেই। লেনদেনের জন্য ডিএসইর নিজস্ব ট্রেড সার্ভার রয়েছে। ওয়েবসাইট কাজ না করলেও লেনদেন নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি। তিনি আরও জানান, ডিএসইর ওয়েবসাইটটিতে কিছুটা ধীর গতি দেখা দেয়ায় তা আপগ্রেড করতে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ১টা ৭ মিনিটে ফের ওয়েবসাইটটি চালু হয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে এসইসির সার্ভিলেন্স বিভাগের প্রধান সাইফুর রহমান বলেন, ডিএসইর ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও বাজারে যথারীতি লেনদেন হয়েছে। ট্রেড সার্ভারের মাধ্যমে ডিএসইর লেনদেন কার্যক্রম পরিচালনা হয়ে থাকে। ওয়েবসাইট বন্ধ হলেও তাতে লেনদেন কার্যক্রমে কোনো ধরনের সমস্যা নেই।


Sunday, 27 March 2011

আলোচনা সভায় কাদের সিদ্দিকী : জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক : জাতিকে বিভক্ত করতেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ












স্টাফ রিপোর্টার
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম বলেছেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কাজেই জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক নন। তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তিনি দেশ ও স্বাধীনতার জনক। সামরিক বাহিনী থেকে তত্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেদিন জিয়ার কণ্ঠই মানুষের মন ছুঁয়েছিল। তার ঘোষণার পরপরই মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বর্তমান সরকারের যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ সম্পর্কে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে তার সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। এ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানের নয়। এখানকার আইনজীবীদের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে আজ এ অবস্থা হতো না; বরং এখন জাতিকে বিভক্ত করতেই এ বিচার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই সরকার আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এটা দেরি করবে, যাতে এ বিষয়টি ব্যবহার করে আবারও নির্বাচনে জেতা যায়। এটা হলে জাতি কখনও মেনে নেবে না। তিনি গতকাল ‘স্বাধীনতার ৪০ বছর ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম বীরপ্রতীক বলেন, ’৭১ সালে আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতা ও বর্তমানের অনেক এমপি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ছিলেন। এখন তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের জাহির করছেন। কেউ কেউ বলছেন, বর্তমানে মন্ত্রিসভায় এবং প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের মধ্যেও যুদ্ধাপরাধী রয়েছে। নিজেদের দলের লোকদের বাঁচানোর স্বার্থে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে কয়েকজনের বিচার করা হলে তা জাতি গ্রহণ করবে না। তাছাড়া যুদ্ধাপরাধী বিচারের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে তা আন্তর্জাতিক মানের নয়। .এ ট্রাইব্যুনালের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মনে হচ্ছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতে চাচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে তারা পরবর্তী নির্বাচনে সুবিধা নিতে চায়। এটা হলে জাতি মেনে নেবে না। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সামাজিক সংগঠন ‘মুক্তচিন্তা’ এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী আমিরুল মোমেনীন মানিক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক নন। গ্রেফতার হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি মুক্তিসংগ্রামের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়েছেন। গ্রেফতারের পর তার পরোক্ষ নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তিনি দেশ ও স্বাধীনতার জনক, এটা ঐতিহাসিক সত্য; কিন্তু তিনি স্বাধীনতার ঘোষক নন। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সামরিক বাহিনী থেকে তত্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। রেডিওতে তার ঘোষণাই প্রচারিত হয়েছিল। জিয়ার কণ্ঠ মানুষের মন ছুঁয়েছিল। তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেই মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জিয়া নিজেও ২৭শ’ সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। কাদের সিদ্দিকী আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিশেষ সমর্থন পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি হওয়া হেলাল মোর্শেদ ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় ডিজিএফআইর মহাপরিচালক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করায় তিনি অনেক লোকের ওপর নির্যাতন করেছিলেন। পিঠের চামড়া তুলে নিয়েছিলেন।
ড. ইউনূসের বিষয়ে সরকারের ভূমিকার নিন্দা করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, দেশে সম্মানী লোককে সম্মান দেয়া হচ্ছে না। নোবেল বিজয় করে ড. ইউনূস দেশের জন্য যে সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছেন তা আগামী হাজার বছরে সম্ভব নাও হতে পারে। সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তাকে আজ অপমান করছে। একসময় আমি যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, তাও হয়তো কেউ অস্বীকার করতে পারে। কারণ আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই আমি কতজনকে হত্যা করেছি। তিনি দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের প্রশংসা করে বলেন, প্রথমে নবাগত হিসেবে আমি তাকে গ্রহণ করতে পারতাম না; কিন্তু তার সাহসী লেখা পড়তে পড়তে আমার ভালো লেগে যায়। জেলখাটার আগে তাকে যদি একশ’জনে চিনতো, এখন তাকে হাজার জনে চেনে। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পর সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ মর্যাদা পেলে তিনিই পাবেন। তার অবস্থানে থাকতে পারলে তিনি সাংবাদিকতাকে অনেক দূর নিয়ে যাবেন। দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক কোনো হিসাব নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম বীরপ্রতীক আরও বলেন, সরকারের ঘরে যেসব স্বাধীনতাবিরোধী রয়েছে, আগে তাদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর ঘরে যেসব যুদ্ধাপরাধী রয়েছে, তাদের কথা বলা হচ্ছে না। সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তাদের নিজেদের ঘরের স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার করবে না। কিন্তু এর বিচার একদিন হবেই। ক্ষমতার পালাবদল হলে জনতার আদালতে তাদের বিচার হবে
।

সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতি : বাকশাল আমলের মতো বিচার বিভাগ ফের পরাধীন করা হচ্ছে : দেশে কার্যত কোনো সংবিধান নেই












স্টাফ রিপোর্টার

বাকশাল আমলের মতো বিচার বিভাগকে পুনরায় সরকারের আজ্ঞাবহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সরকার বিচার বিভাগকে তার অধীন করে নিতে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করছে। বিচার বিভাগ নিয়ে এ খেলা বন্ধ করা নাহলে আইনজীবীদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে ঘোষণা দেন তিনি। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে আজ সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সংবিধান জগাখিচুড়ির মধ্যে রয়েছে। পুনর্মুদ্রণে আদালতের নির্দেশও কার্যকর করা হয়নি। গতকাল দুপুরে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, সহ-সম্পাদক মোরশেদ আল মামুন লিটনসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বার প্রেসিডেন্ট বলেন, মূল সংবিধানে বিচার বিভাগ স্বাধীনই ছিল। কিন্তু বাকশাল কায়েমের সময় বিচার বিভাগকে সরকারের আজ্ঞাবহ করা হয়। পরে পঞ্চম সংবিধানের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে আবার স্বাধীন করা হয়। বর্তমানে সংবিধান থেকে ১১৬ অনুচ্ছেদ উঠিয়ে দিয়ে বিচার বিভাগকে আবার নির্বাহী বিভাগের অধীন করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ ও স্বাধীন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার বিচার বিভাগকে আবারও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আইনজীবীদের নিয়ে সরকারের এ হীন চেষ্টা রুখে দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকারের এ চেষ্টা সফল হলে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। বিচারকরা সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করতে বাধ্য হবেন। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি-পদোন্নতির বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাঠানো হলেও সাংবিধানিক অস্পষ্টতার কারণে সুপ্রিমকোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই তিনি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবি জানান।
প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশে বর্তমানে সাংবিধানিক শূন্যতা চলছে। কোন সংবিধান কার্যকর এটি কারও জানা নেই। একেক মন্ত্রী একেক ধরনের কথা বলছেন। কেউ বলছেন, ছাপানো সংবিধান অনুযায়ী দেশ চলছে। আবার কেউ বলছেন, আগের সংবিধান অনুযায়ীই দেশ চলছে। আসলে কোন মন্ত্রীর কথা সঠিক সেটা সরকারও জানে না। সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তায় দেশের মানুষ চরম হতাশ। সরকারকে দ্রুত বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনী রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করার কথা বলা হচ্ছে। অথচ আদালতের রায় পাশ কাটিয়ে তারা নিজেদের মতো করেই সংবিধান সংশোধন করেছেন।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশকে সরকার আবারও একদলীয় বাকশালী অপশাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করে দেশে একদলীয় বাকশাল কায়েম করে মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। বাকশালের উত্তরসূরি বর্তমান সরকারও সংবিধানকে কেটেছিঁড়ে বাকশালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাকশালী শাসনের কবল থেকে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদ মাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। একইসঙ্গে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও তিনি ওই সংশোধনীর মাধ্যমে নিশ্চিত করেন। বর্তমানে আবারও সেই বাকশালের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বাকশাল কায়েমের স্বপ্ন পূরণ হলে দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে চতুর্থ সংশোধনীর দিকে সরকারকে না হাঁটার জন্য হুশিয়ার করে দিয়ে তিনি বলেন, এদেশটি আপনাদের একার নয়। ১৬ কোটি মানুষের এদেশে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে দেয়া হবে না। আইনজীবীরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বাকশাল কায়েমের চেষ্টা প্রতিহত করবে। বাকশাল কী জিনিস, দেশের মানুষ তা হাড়ে হাড়ে বোঝে।
পঞ্চম সংশোধনী রায় রিভিউর জন্য সরকার পক্ষের আবেদন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, একদলীয় বাকশাল কায়েমের জন্য সরকার শেষ পদক্ষেপ নিয়েছে
।