Wednesday, 29 June 2011

গণপ্রতিরোধে ভারতকে ভূমি ছাড় দেয়া স্থগিত











মো. দেলোয়ার হোসেন জৈন্তাপুর (সিলেট)
গণপ্রতিরোধের মুখে সিলেটের তামাবিল সীমান্তে বাংলাদেশের জমি ভারতকে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ স্থগিত করেছে সরকার। লোকদেখানো ভারত-বাংলাদেশ যৌথ জরিপের মাধ্যমে তামাবিল স্থলবন্দর সংলগ্ন তিন একর জমি ভারতের হাতে তুলে দেয়ার খবর পেয়ে স্থানীয় জনগণ, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। স্থানীয় জনগণ, সীমান্তরক্ষী, এমনকি জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের মতামত উপেক্ষা করে উপরের নির্দেশে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের কিছু অংশ ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে—এ খবর শুনে গতকাল সকাল থেকেই এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। এক পর্যায়ে এই বিক্ষোভে এলাকার সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিমসহ অন্য জনপ্রতিনিধিরাও শরিক হন। এলাকাবাসীর চাপের মুখে এক পর্যায়ে জরিপ কাজ স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর আগে জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর ও কেন্দ্রিবিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ভারতের হাতে তুলে দেয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে প্রায় এক হাজার একর জমি যৌথ জরিপসহ নানা অজুহাতে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার জন্য দীর্ঘদিন থেকে ভারত চাপ দিয়ে আসছে। অতীতের সরকারগুলো কখনও এগুলো আমলে না নিলেও বর্তমান সরকারের আমলে ইতোমধ্যে জৈন্তাপুরের পদুয়ায় সাড়ে তিনশ’ একর জমি ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা সীমান্তে ম্যাপ পাল্টে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি ভারত তার দখলে নিয়েছে বলে গত ডিসেম্বরে জাতীয় দৈনিকে খবর বেরিয়েছে। এর আগে গত অক্টোবরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২টি এলাকায় জিরো পয়েন্টের ৫০ গজের মধ্যে ভারতকে কাঁটাতারেরবেড়া নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জিরো পয়েন্টের দেড়শ’ গজের মধ্যে কোনো দেশেরই স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। এভাবে বর্তমান সরকারের আমলে নানা অজুহাতে বাংলাদেশের বহু ভূখণ্ড ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জকিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারত বাংলাদেশের নিজস্ব ভূখণ্ডেও স্থাপনায় বাধা দিচ্ছে। সিলেটের জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় সীমান্ত এলাকা নিয়ে দীর্ঘ দিন যাবত্ বিরোধ চলে আসছিল। সীমান্ত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দিল্লি ও ঢাকায় এবং সিলেট ও ডাউকিতে একাধিকবার উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়। জরিপ টিম সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ও ভারত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সিলেট সীমান্তের অপদখলীয় ভূমি চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত হয়। এরই আলোকে গত ডিসেম্বর থেকে সীমান্তে উভয় দেশের জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপ সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে। ভারতের চাপের মুখে ও অবৈধ দাবির প্রেক্ষিতে বহুবার জরিপ কাজ স্থগিত হয়ে যায়। এ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ উচ্চ পর্যায়ে একাধিকবার বৈঠক হলেও কোনো সফলতা আসেনি। গত ২ ও ৩ জুন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার সঞ্জয় ভাট্টাচার্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক) ড. কামালের নেতৃত্বে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে ডাউকি ও তামাবিলে একাধিক বৈঠকের পর সিলেটের সীমান্ত এলাকার ১০টি স্থান চিহ্নিত করা হয়। এ থেকে ৪টি স্থান পাদুয়া, সোনারহাটের লিংকহাট, তামাবিল, নলজুরী এলাকার কিছু স্থান ভারতকে ছেড়ে দেয়ার গোপন সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ ও ৫ জুন পাদুয়া সীমান্তের ১২৭০নং মেইন পিলার থেকে ১২৭১-এর ৭এস পিলার পর্যন্ত বিএসএফ পোস্ট থেকে ৫০ মিটার ভূমি ভারতকে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্যে ৩টি স্থানে প্রায় ৩৫০ একর ভূমি বাঁশের খুঁটি বসিয়ে ভারতকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। তাতে ভারতীয় বিএসএফ ও নাগরিকরা সন্তুষ্ট না হয়ে বাংলাদেশের পিয়াইন নদী পর্যন্ত প্রায় হাজার একর ভূমি দাবি করায় জরিপ কাজ স্থগিত হয়ে যায়।উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে গতকাল সকাল ১১টায় তামাবিল জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন ১২৭৫নং পিলারের ১ এস থেকে ৭ এস পর্যন্ত প্রায় ৩ একর ভূমি ভারতকে বুঝিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে উভয় দেশের যৌথ সার্ভে দল সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সহকারী পরিচালক জরিপ মো. দবির উদ্দিন এবং ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সহকারী পরিচালক জরিপ এসানপ্লাইসহ উভয় দেশের ১৫/২০ জন সদস্য। উভয় দেশের প্রতিনিধিরা জরিপ কাজ শুরু করলে স্থানীয় সীমান্তবাসী, কয়লা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের গণপ্রতিরোধের মুখে জরিপ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে ভারতকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়ার প্রতিবাদে মিছিল ও সমাবেশ করে। সংবাদ পেয়ে সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম ও গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী ঘটনাস্থলে এসে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এসময় সাবেক এমপি বলেন, দেশ বিভক্তির পর ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ করা হয়, ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। ২০০২ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ জরিপ টিমের উদ্যোগে সীমান্ত জরিপ কাজ হয়। সীমান্তের ভূমি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। তখন ভারত কোনো প্রতিবাদ করেনি। দীর্ঘদিন পর ভারতীয় আগ্রাসী তত্পরতায় মনে হচ্ছে, এটা বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, গত বছর তামাবিল স্থলবন্দর থেকে সরকার ৫০ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার ৪২২ টাকা রাজস্ব আয় করে। এই স্থলবন্দরের ৩ একর ভূমি ভারতকে সরকার কিসের বিনিময়ে দিতে চায়? দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সীমান্তবাসীর সঙ্গে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও এই আগ্রাসী তত্পরতা প্রতিহত করব। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, উচ্চ পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে, বর্তমানে সীমান্তবাসীর বাধারমুখে জরিপ কাজ স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। জরিপ টিমের সহকারী পরিচালক দাবির উদ্দিন বলেন, উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সীমান্তের অপদখলীয় ভূমি ভারতকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের লক্ষ্যে আমরা জরিপ কাজ করছি। তামাবিল এলাকায় অপদখলীয় ভূমি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন প্রকার অপদখলীয় ভূমি নাই বলে এলাকাবাসীকে জানান।কয়লা ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন, সারওয়ার হোসেন সেদু, মনিরুজ্জামান মিন্টু, কয়লা শ্রমিক সভাপতি বাচ্চু মিয়া, সেক্রেটারি লিটন মিয়াসহ সীমান্তবাসী প্রতিবাদ সভায় বলেন, সরকার এই স্থলবন্দর থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। বর্তমানে তামাবিল স্থলবন্দরে যে ভূমি রয়েছে তা ব্যবসায়ীদের সংকুলান হচ্ছে না। কিসের স্বার্থে গোপন চুক্তিতে সরকার ভারতকে তামাবিল স্থলবন্দরের ভূমি ছেড়ে দেয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আমরা জীবন দিয়ে হলেও প্রতিহত করব। এর আগে বিজিবি ৫ ব্যাটালিয়নের সিও লে. কর্নেল মো. শফিউল আলম জানান, উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে উভয় দেশের জরিপ দল কাজ করছে। জমি ছেড়ে দেয়া বা পিলার স্থাপনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। পাদুয়া সীমান্তে বাঁশের খুঁটি বসানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ প্রক্রিয়ায় কাজ করা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে।এ বিষয়ে জরিপ অধিদফতরের পরিচালক মো. ইকবাল হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, সীমান্ত সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। বিষয়টি ঝুলন্ত না রেখে সব মহলের গ্রহণযোগ্য সমাধান হোক—এটিই প্রত্যাশা করি। যাতে উভয় রাষ্ট্রের সীমান্তবাসী শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। এখন আর সীমান্ত নির্ধারণের প্রশ্নই ওঠে না। তবে উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত যা হবে, এ বিষয়ের ওপর আমার বলার কিছু নেই। দুটি রাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই বলা যাবে না। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় দুটি জরিপ টিমকে প্রায় সময় সীমান্তে জরিপ কাজ করতে দেখা যায়। তবে এতে কোনো সফলতা আসেনি। স্থানীয় জরিপ টিমের টিম লিডার সহকারী পরিচালক (জরিপ) মো. দবির উদ্দিন বলেন, আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না। তবে যা করছি উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই করছি। আমাদের কাজকর্ম দেখে বুঝে নিন আমরা কী করছি।১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশ যৌথ জরিপের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত হয়। ল্যান্ড বাউন্ডারি এগ্রিমেন্টে (এলবিএ) উল্লেখ আছে—চুক্তি স্বাক্ষরের ৬ মাসের মধ্যে অপদখলীয় ভূমি কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ ছাড়াই হস্তান্তর করতে হবে। বাংলাদেশ তা মানলেও ভারতীয়রা এখনও তা মানেনি। ফলে প্রতিনিয়ত সমস্যা লেগেই আছে। ২০০২ সালে সীমান্তে উভয় দেশের মাঠ পর্যায়ে যে জরিপ হয়েছে, তাতে ১০টি স্থানের জমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও বাংলাদেশ সরকারের নামে রেকর্ড হয়। তখন ভারত কোনো প্রতিবাদ করেনি। জমি ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে সিলেট কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি এমদাদ হোসেন জানান, আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে আকুল আবেদন, কোনো অপশক্তি যেন আমাদের এক ইঞ্চি ভূমিও নিতে না পারে। তামাবিল স্থলবন্দর থেকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে। এ স্থলবন্দরের কিছু জায়গা ভারতকে ছেড়ে দিলে সীমান্তের ব্যাপক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাবে, কয়লা ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হবেন, হাজার হাজার পাথর, বালু ও কয়লা শ্রমিক বেকার হওয়াসহ সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা বর্তমানে শান্তিতে উভয় দেশ ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছি। হঠাত্ করে জমি দেয়ার সিদ্ধান্ত কোনো মহলই মেনে নিতে পারবে না। তামাবিল স্থলবন্দর রক্ষার্থে প্রয়োজনে সীমান্তবাসীকে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আগামী ২০ জুন গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনার হাটের লিংকহাট সীমান্ত এলাকার বেশ কিছু ভূমি ভারতকে ছেড়ে দিতে পারে বাংলাদেশ। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এ জরিপ কাজ চলবে বলে জানা যায়।
১২ পয়েন্টে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দখলে নিয়ে বেড়া : এর আগে গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তের ৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অনুমতি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নেয় ভারত। প্রথমে বিডিআর এ কাজে বাধা দিলেও উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে তারা কেবল সরেই আসেনি, মাপঝোক করে স্থাপনা তৈরির জন্য বিএসএফকে জায়গাও বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে। সীমান্তের ৪৬ পয়েন্টে বাংলাদেশের ভূমিতে বেড়া নির্মাণের চেষ্টা দীর্ঘদিন থেকে ভারত করে আসছিল। কিন্তু সফল হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত বছর জানুয়ারিতে ভারত সফর ও ৫০ দফা সমঝোতা স্মারকের পরই সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে আবারও সক্রিয় হয় ভারত। এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কিং টিম সরেজমিনে ভারতের দাবিকৃত জায়গাগুলো পরিদর্শন করে।। কিমিটি ৬টি শর্ত সাপেক্ষে সীমান্তের ১২২টি পয়েন্টে বাংলাদশের জমিতে বেড়া নির্মাণ করতে দেয়ার নীতিগম সিদ্ধান্ত দেয়। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল তিনবিঘা করিডোর ইস্যু নিষ্পত্তি করা, ৩২টি ফেনসিডিল কারখানা সীমান্ত থেকে সরিয়ে নেয়া, ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান, পঞ্চগড় ও বাংলাবন্ধায় পর্যটন সুবিধা দেয়া এবং অপদখলীয় ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান ইত্যাদি। কিন্তু এসব ইস্যুর সমাধান ছাড়াই গত বছর অক্টোবরে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে আখাউড়াসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ১২টি স্থানে সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে মাত্র ৫০ গজের মধ্যে ভারত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে। এতে করে এসব স্থানে কার্যত বাংলাদেশের একশ’ গজ ভূমির ওপর অধিকার নষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সংবিধান সংশোধন কমিটির রিপোর্ট সংসদে উত্থাপিত : তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন










সংসদ রিপোর্টার
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনুপস্থিতিতে গতকাল জাতীয় সংসদে বহুল আলোচিত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের সুপারিশ সংবলিত রিপোর্ট উত্থাপিত হয়েছে। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির চেয়ারপার্সন ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির ২১১ বিধির (১) উপবিধি অনুযায়ী রিপোর্ট উত্থাপন করেন। বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের সাড়ে ১০ মাস পর তাদের রিপোর্ট উত্থাপন করা হয়েছে। এসময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন। সংসদে সভাপতিত্ব করছিলেন স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ।কমিটি তাদের রিপোর্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে গণতন্ত্রের পরিপন্থী উল্লেখ করে এ ব্যবস্থা বিলুপ্তের সুপারিশের পাশাপাশি মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ ভাঙার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের বিধান সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহর নিচে অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য পরিভাষা সংযোজন এবং শর্তসাপেক্ষে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ রাখা, আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের মূলনীতি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাসহ ’৭২-এর সংবিধানের ৪ মূলনীতি পুনঃপ্রবর্তন, সরকারি-আধাসরকারি অফিসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা, জাতীয় পরিচয় ‘বাঙালি’, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি, নারী আসন ৫টি বৃদ্ধি করে ৫০টি করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়া নির্বাচন কমিশনার চারজন করা, রাষ্ট্রপতির জারিকৃত জরুরি অবস্থার মেয়াদ ১২০ দিন নির্দিষ্টকরণ, যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের নির্বাচনে অযোগ্য ও ভোটার হতে না পারা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা, বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর রাখা, ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে ’৭২-এর অনুরূপ করা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সংহতি রক্ষা সংবলিত ধারার বিলুপ্তি, সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল নামে নতুন তিনটি তফসিল সংযোজন করে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত, বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত শেষে অর্থাত্ ২৬ মার্চের রাতের প্রথম দিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্তসহ ৫১ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেয়া কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত সার্চ কমিটির প্রস্তাব বাদ দিয়ে বিশেষ কমিটি করে ৫ জন কমিশনার রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব করেছে। পরে স্পিকার রিপোর্টটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। এদিকে কমিটির সদস্য রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু ১, ৩ ও ১৭ নং সুপারিশে আপত্তি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার সুপারিশ থাকার প্রতিবাদে এরই মধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও শরিক দল জামায়াতে ইসলামী দেশব্যাপী হরতাল করেছে।চল্লিশ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ৫১টি সুপারিশ ছাড়াও কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈঠকে আলোকচিত্র রয়েছে। প্রতিবেদনটির প্রথম অংশে কমিটির চেয়ারপার্সনের ৮ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যের শেষ লাইনে ‘এ রিপোর্ট গ্রহণের জন্য কমিটি সর্বসম্মতক্রমে সুপারিশ করছে’ বাক্যটির ‘সর্বসম্মতক্রমে’ শব্দটি কেটে দেয়া হয়েছে। রিপোর্ট উত্থাপন করার সময় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে ১৯৭২ সালে তারই নেতৃত্বে জাতি যে সংবিধান পেয়েছিল, সেটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম লিখিত একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান। ১৯৭৫ সালে জাতি শুধু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারেই হারায়নি, সে সঙ্গে স্বাধীনতার মূল চেতনার পথও হারিয়েছিল। এরপর অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় দখল শুরু হয়। এ কারণে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি যেন এভাবে ক্ষমতায় না আসতে পারে, সেজন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংবিধানে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান ছিল। দলীয় সরকারের অধীনে পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচনের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের বিধানটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুরুতে এ ব্যবস্থাটি বিশ্বে অনন্য মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদে এ ব্যবস্থায় বেশকিছু সাংবিধানিক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া ১/১১ খ্যাত পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় এদেশের জাতীয় রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন শেষ না করে নিজেরাই সরকার বনে দেশ শাসন শুরু করে এবং তা দু’বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত করে। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এই জাতি দীর্ঘ দু’বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনের কবলে পড়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সাংবিধানিক দুর্বলতার সুযোগে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের দুজন প্রধান শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক রাখে। গণতন্ত্রের অব্যাহত যাত্রা ব্যাহত হয়, শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের চরিত্র হনন করা হয় এবং একইসঙ্গে সুকৌশলে আইনের অপব্যাখ্যা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ দু’বছর প্রলম্বিত করা হয়।তিনি বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী। অতিসম্প্রতি সুপ্রিমকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছেন। কমিটির সদস্য আদালতের এ রায় মেনে নিয়ে এ ব্যবস্থার পরিবর্তনে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার ধারা অব্যাহত রাখা শ্রেয় বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তবে অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে বিরোধী দল সংসদে এসে সাংবিধানিক পন্থায় যে প্রস্তাব রাখবে—তা নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা শুরু করে সমঝোতার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেতে পারে বলে কমিটি মনে করে। জাতি এখনও আশা করছে বিরোধীদলীয় নেতা ও তার দলের সদস্যরা সংসদে উপস্থিত হয়ে সংবিধান সংশোধন আলোচনায় অংশগ্রহণ করে সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারার বিকাশে মূল্যবান অবদান রাখবেন।সাজেদা চৌধুরী বলেন, বিগত (বিএনপি ও জামায়াত জোট) সরকারের সময়ে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ছাত্ররাজনীতির ছত্রছায়ায় এদেশে জঙ্গিবাদের মতো অপশক্তির জন্ম ও প্রসার লাভ করে। অথচ ইসলামসহ কোনো ধর্মই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয় না। এমনকি ইসলামে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িও নিষিদ্ধ আছে। দেশের উন্নতি নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক মদতে জঙ্গিবাদের উত্থান বন্ধ করতে হবে। কমিটির সদস্যরা মনে করেন, ধর্মের অপব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা যে কোনো মূল্যে রোধ করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী আজ চলছে পরিবর্তনের পালাবদল। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই প্রথাগত ধ্যান-ধারণার অচলায়তন ভেঙে দিচ্ছে। এসব বিবেচনায় পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র তাদের সংবিধান আধুনিক ও যুগোপযোগী করে নিচ্ছে। তবে বিশেষ কমিটি সংবিধানের কোনো মৌলিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেনি। কেবল ’৭২ সালের যে সংবিধান জাতিকে আধুনিক ও যুগোপযোগী দিকনির্দেশনা দিয়েছিল, সেটাই পালন করেছে কমিটি। এই বিশেষ কমিটির সুপারিশের আলোকে গণতন্ত্র ফিরে পাবে তার আপন চলার গতি, ধর্ম হবে যার যার, রাষ্ট্র হবে সব ধর্মের, ভবিষ্যত্ প্রজন্ম পাবে আগামী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এ রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার অনিঃশেষ অনুপ্রেরণা।কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী গত বছরের ২১ জুলাই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা সংসদে বিশেষ কমিটির সদস্যদের নাম প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে তা পাস হয়। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারপার্সন এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের ‘সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এসময় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কাছে তাদের প্রতিনিধির নাম চাওয়া হলে তারা নাম পাঠায়নি। কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন—আওয়ামী লীগের আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, রহমত আলী, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু, নারী ও শিশু প্রতিমন্ত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, ফজলে রাব্বী মিয়া, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। বর্তমান প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক সামগ্রিকতা, সংবিধানের বেশ ক’টি সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত সুপ্রিমকোর্টের রায় এবং কমিটিতে প্রাপ্ত মতামত ও প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটি ২৭টি বৈঠক করে। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতামত নিতে দেশের সাবেক ৫ জন প্রধান বিচারপতি, মূল সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণপরিষদের ১৮ জন আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, দেশের প্রথিতযশা ২৬ জন সম্পাদক, বিশিষ্টজন ২৬ এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ও পুরনো রাজনৈতিক দল এবং সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতারা মতামত দেন। সুপারিশ তৈরি করার আগে এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গেও ক’বার বৈঠক করে কমিটি। কিন্তু বিশেষ কমিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করলেও তাদের অধিকাংশ সুপারিশ মেনে নেয়নি। এমনকি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য প্রস্তাবনাও ওই সুপারিশে স্থান পায়নি।

সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন সুপারিশগুলো হচ্ছে :১. সংবিধানের প্রস্তাবনার ওপর সন্নিবেশিত হবে—‘বিছমিল্লাহির রহমানির রহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহের নামে/পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে’।২. সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদে ক) ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ শব্দের পরিবর্তে ‘জাতীয় মুক্তির ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে। খ) প্রস্তাবনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত হবে—‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোত্সর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এ সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’৩. সংবিধানের অনুচ্ছেদে প্রতিস্থাপিত হবে—২ ক) রাষ্ট্রধর্ম- প্রজাতন্ত্রেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।৪. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪-এ নতুন দফা (৫) সংযোজিত হবে—‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সকল সরকারি ও আধাসরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে।’৫. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমমন্ত্রীর প্রতিকৃতি বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৪ ক) বিলুপ্ত হবে।৬. অনুচ্ছেদ ৬-এর পরিবর্তে ‘৬ (১) বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে। (২) বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন’ প্রতিস্থাপিত হবে।৭. অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারীদের শাস্তির বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৭-এর পর নতুন অনুচ্ছেদ ৭ক) সন্নিবেশিত হবে। এতে এটিকে অপরাধ বিবেচনায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে এবং ওই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে বলে উল্লেখ করা হয়। অপরাধে দোষী ব্যক্তি সংসদেও আইন দ্বারা অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।৮. সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত বিধানাবলী সংশোধন অযোগ্য করার জন্য নতুন অনুচ্ছেদ ৭(খ) সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘এ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহাই কিছু থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম ক-ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের অনুচ্ছেদ ১৫০-সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।’৯. অনুচ্ছেদ-৮-এর রাষ্ট্রীয় মূলনীতির দফা ১ ও ১(ক)-এর পরিবর্তে ‘(১) জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা এ নীতিসমূহ এবং তত্সহ এ নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে,’ প্রতিস্থাপিত হবে।১০. বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯-এ প্রতিস্থাপিত হবে ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’১১. অনুচ্ছেদ ১০-এ প্রতিস্থাপিত হবে, ‘সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি—মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’১২. ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার ও (ঘ) কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন-বিলোপ করা হইবে,’ প্রতিস্থাপিত হবে।১৩. অনুচ্ছেদ ১৮-এর পর নতুন অনুচ্ছেদ ১৮(ক) পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সন্নিবেশিত হবে। এতে বলা হয়, ‘পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন-রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত্ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’১৪. ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন,’ অনুচ্ছেদ ১৯-এর দফা (৩) সংযোজিত হবে।১৫. উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশ নামে ২৩ (ক) নতুন অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হবে। সুপারিশে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’১৬. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫-এর দফা (২) বিলুপ্ত হবে।১৭. অনুচ্ছেদ ৩৮-এর পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত হবে, ‘সংগঠনের স্বাধীনতা—(১) জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে : তবে শর্ত থাকে যে, কোনো ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি (ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এ সংবিধানের পরিপন্থী হয়।’১৮. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪২-এর দফা ২ ও ৩-এর পরিবর্তে ‘২ এ অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত আইনে ক্ষতিপূরণসহ বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্তকরণ বা দখলের বিধান করা হইবে এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ কিংবা ক্ষতিপূরণ নির্ণয় ও প্রদানের নীতি-পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হইবে; তবে অনুরূপ কোনো আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান অপর্যাপ্ত হইয়াছে বলিয়া সেই আইন সম্পর্কে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না,’ প্রতিস্থাপিত হবে।১৯. অনুচ্ছেদ ৪৪-এর পরিবর্তে মৌলিক অধিকার বলবত্করণ ‘(১) এ ভাগে প্রদত্ত অধিকারসমূহ বলবত্ করিবার জন্য এ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের ১ দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা রুজু করিবার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) এ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে সকল বা উহার যে কোনো ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন,’ প্রতিস্থাপিত হবে।২০. মূল সংবিধানের কতিপয় আইনের হেফাজত-সংক্রান্ত বিধান এবং যুদ্ধাপরাধী বিষয়ে ৪৭ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সুপারিশ রয়েছে। ২১. নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালে কতিপয় বিধানের অপ্রযোজ্যতা (অনুচ্ছেদ ৫৮ ক) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হবে। ২২. নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২ক পরিচ্ছেদ (অনুচ্ছেদ ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ, ৫৮ঙ)। এতে বলা হয়, সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদ বিলুপ্ত হবে।২৩. অনুচ্ছেদ ৬১-এ সংশোধনের সুপারিশে বলা হয়, ‘নিয়ন্ত্রিত হইবে এবং যে মেয়াদে ৫৮খ অনুচ্ছেদের অধীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকিবে সেই মেয়াদে উক্ত আইন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পরিচালিত হইবে,’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘নিয়ন্ত্রিত হইবে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।২৪. সংসদে নারী আসন বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৬৫-এর ক দফার (৩)-এর ‘পয়তাল্লিশটি আসন’ শব্দগুলোর পরিবের্তে ‘পঞ্চাশটি আসন’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।২৫. সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা ৬৬ অনুচ্ছেদের ক দফায় ‘ঙ তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইবুন্যাল) আদেশের অধীন যে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন;’ খ দফায় ‘(ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা (খ) অন্যক্ষেত্রে পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে,’ প্রতিস্থাপিত হবে।২৬. অনুচ্ছেদ ৭০-এ ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া—(১) কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি—(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না,’ প্রতিস্থাপিত হবে।২৭. রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিলে সম্মতিদান বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৮০-এর ক দফা (৩)-এর ‘সম্মতি দান করিবেন’ শব্দগুলির পরে ‘কিংবা তাহাতে সম্মতি দানে বিরত রহিলেন ঘোষণা করিবেন’ শব্দ সন্নিবেশিত হবে। খ দফা (৪)-এর ‘মোট সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের দ্বারা’ শব্দগুলো বিলুপ্ত হবে।২৮. আর্থিক ব্যবস্থাবলী সম্পর্কিত বিলে রাষ্ট্রপতির সুপারিশ বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৮২-এর শর্তাংশে ‘তবে শর্ত থাকে যে’ শব্দগুলো ও কমার পরিবর্তে ‘কোন অর্থ বিলে’ শব্দগুলো সন্নিবেশিত হবে।২৯. সংসদ ভঙ্গ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ প্রণয়ন ক্ষমতার সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের দফা (১)-এর ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।৩০. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯৫-এর পরিবর্তে ‘৯৫(১) প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগদান করিবেন’ প্রতিস্থাপিত হবে। বাহাত্তরের সংবিধানের আলোকে এ অনুচ্ছেদে ২ ও ৩ দফাও প্রতিস্থাপিত হবে।৩১. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও বিচারকের ন্যায় অপসারণযোগ্য পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের অপসারণ পদ্ধতি বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯৬-এ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রেখে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছে।৩২. অনুচ্ছেদ ৯৮-এর সুপ্রিম কোর্টেও অতিরিক্ত বিচারকগণ বিষয়ে ‘যে কোনো অস্থায়ী মেয়াদের জন্য আপিল বিভাগে আসন গ্রহণের ব্যবস্থা করিতে পারিবেন’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপনের সুপারিশ রয়েছে।৩৩. অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের বিচার বিভাগীয়/আধা বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগের বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯৯-এ বলা হয়, তারা প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। তবে আপিল বিভাগে ওকালতি বা কার্য করতে পারবেন।৩৪. সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ ‘সুপ্রিম কোর্টের আসন—রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকিবে, তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লইয়া প্রধান বিচারপতি সময়ে সময়ে অন্য যে কোনো স্থান বা স্থানসমূহ নির্ধারণ করিবেন, সেই স্থান বা স্থানসমূহে হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হইতে পারিবে’ প্রতিস্থাপন হবে।৩৫. সংবিধানের ১০১ ও ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার/কতিপয় আদেশ ও নির্দেশ দানে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার বিষয়ে কিছু প্রস্তাব প্রতিস্থাপনের কমিটির সুপারিশ করা হয়।৩৬. আপিল বিভাগের এখতিয়ার বিষয়ে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের সংশোধন এনে ‘খ দফায় কোন মৃত্যুদণ্ড বহাল করিয়াছেন কিংবা কোন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিয়াছেন; অথবা’ প্রতিস্থাপিত হবে।৩৭. সুপ্রিম কোর্টের বিধিপ্রণয়ণ ক্ষমতা বিষয়ে অনুচ্ছেদ ১০৭-এর সংশোধিত দফা ২ ও ৩ প্রতিস্থাপনের সুপারিশ রয়েছে।৩৮. অনুচ্ছেদ ১১৬-এ অধস্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিষয়ে প্রতিস্থাপিত হবে, বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকবে এবং সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে তা প্রযুক্ত হবে। ৩৯. প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে—সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮-এর দফা ১ এ তা প্রতিস্থাপিত হবে।৪০. ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির যোগ্যতা সংক্রান্ত ১২২ অনুচ্ছেদের দফা ২-এ সংশোধনী এনে (গ), (ঘ) ও (ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত না হইয়া থাকেন’ প্রতিস্থাপন করা হবে।৪১. নির্বাচনের মেয়াদ অনুষ্ঠানের সময় সংক্রান্ত সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে দফা ৩-এর পরিবর্তে ‘(৩) সংসদ সদস্যের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে—(ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপদফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ উক্ত উপদফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না’ প্রতিস্থাপিত হবে। ৪২. জরুরি অবস্থার মেয়াদ নির্ধারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১৪১ক এর দফা (১)-এর ‘তাহা হইলে তিনি’ শব্দগুলোর পর ‘অনধিক একশত কুড়ি দিনের জন্য’ শব্দগুলো সন্নিবেশিত হবে।৪৩. সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধানের বিধান সংশোধনের ক্ষমতা বিষয়ে সুপারিশ প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে প্রতিবেদনে।৪৪. আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রপতি ও সংসদে পেশ সংক্রান্ত ১৪৫ক অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের সুপারিশ রয়েছে।৪৫. প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পদ সংক্রান্ত ১৪৭ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হবে। সেই সঙ্গে এ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সুপারিশ রয়েছে।৪৬. ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী সংক্রান্ত ১৫০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি।৪৭. অনুচ্ছেদ ১৫২-এর উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টা অভিব্যক্তির সংজ্ঞা বিলুপ্ত হবে। এ অনুচ্ছেদে সংশোধনীর সুপারিশ রয়েছে।৪৮-৫০ সংবিধানের প্রথম তফসিল (অনুচ্ছেদ ৪৭), তৃতীয় তফসিল (অনুচ্ছেদ ১১৮), চতুর্থ তফসিল (অনুচ্ছেদ ১৫০) সংশোধনের প্রস্তাব করেছে কমিটি।৫১. জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রাম এবং ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (অনুচ্ছেদ ১৫০ (২)—চতুর্থ তফসিলের পর ‘সংবিধানের পঞ্চম তফসিল, ষষ্ঠ তফসিল ও সপ্তম তফসিল’ সংযোজিত হবে।

Monday, 13 June 2011

৬টি দৈনিকের জরিপ হরতালের পক্ষে ৮০ শতাংশ ভোট







স্টাফ রিপোর্টার
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও ৩২ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়ে শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটসহ বিভিন্ন দাবিতে বিরোধী দল আয়োজিত হরতালের যৌক্তিকতা নিয়ে পাঠক জরিপ করে ৬টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত পাঠক জরিপের গড় ফলাফলে শতকরা প্রায় ৮০ জনই বিরোধী দলের এ কর্মসূচির প্রতি সমর্থন দেখিয়েছেন। গতকালের দৈনিক যুগান্তরে জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলসহ বিভিন্ন ইস্যুতে টানা ৩৬ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে বিরোধী দল। আপনি কি এটা সমর্থন করেন?’ এ প্রশ্নের জবাবে জরিপে অংশ নেয়া মোট ভোটারের মধ্যে হ্যাঁ বলেছেন ৮৭. ৪৬ শতাংশ এবং না বলেছেন১২.০৫ শতাংশ। গতকালের কালের কণ্ঠের প্রশ্ন ছিল ‘সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রস্তাবেরপ্রতিবাদে বিএনপি- জামায়াতের হরতাল কর্মসূচি সমর্থন করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে জরিপে অংশ নেয়া ভোটারদের ৭১.৩৯ শতাংশ হ্যাঁ এবং ২৮.৬১ শতাংশ না বলেছেন। দৈনিক সমকালের গত ৬ জুন প্রকাশিত সংখ্যার প্রশ্ন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আহূত হরতাল সমর্থন করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৮১.৮২ শতাংশ, না বলেছেন ১৭.৯০ শতাংশ পাঠক। গতকালের দৈনিক যায়যায়দিনের প্রশ্ন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এ দেশে নির্বাচন সম্ভব- মার্কিন বিদায়ী রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির এ বক্তব্যকে আপনি সমর্থন করেন কিনা?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ২২ শতাংশ এবং না বলেছেন ৭২ শতাংশ ভোটার। গতকালের বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রশ্ন ছিল ‘হরতাল প্রত্যাহারে এফবিসিসিআইর আহ্বান সমর্থন করেন কি?’ এই প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৩৮.৯৩ শতাংশ এবং না বলেছেন ৬১.০৭ শতাংশ। দৈনিক প্রথম আলোর গত ৭ জুন সংখ্যা জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই- খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সঙ্গে কি আপনি একমত?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৬৩.৪১ শতাংশ এবং না বলেছেন ৩৫.৩৭ শতাংশ ভোটার। একই পত্রিকার ৬ জুনের জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘সংসদে আসুন, নইলে রায় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত- তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে বিরোধী দলের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য যৌক্তিক বলে মনে করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ২৭.৮২ শতাংশ এবং না বলেছেন ৭০.৭৪ শতাংশ ভোটার। দৈনিক প্রথম আলোর গত ৫ জুন সংখ্যার প্রশ্ন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের পক্ষে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর অবস্থান যৌক্তিক বলে মনে করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ২১.৯২ শতাংশ এবং না বলেছেন ৭৬.৭৩ শতাংশ। গত ৯ জুন একই পত্রিকার প্রশ্ন ছিল ‘শেয়ারবাজারের পরিবেশ স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল- অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে কি আপনি একমত? এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৯.০৭ শতাংশ এবং না বলেছেন ৮৯.৫৫ শতাংশ ভোটার। গত ২ জুন প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর প্রশ্ন ছিল ‘আদালতের রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার সুযোগ নেই- সরকারের এ বক্তব্যের সঙ্গে কি আপনি একমত?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ১৭.৫২ শতাংশ এবং না বলেছেন শতকরা ৮০.৭০ শতাংশ। গত ১০ জুন প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তরের জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবারও ক্ষমতায় বসলে সরাতে পারবেন না। আপনিও কি তাই মনে করেন?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ১২.৪৮ শতাংশ এবং না বলেছেন ৮৫.৮৫ শতাংশ ভোটার। একই পত্রিকার ৯ জুনের সংখ্যায় জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির জন্য আলোচনার দরজা খোলা আছে। এতে বিএনপির সাড়া দেয়া উচিত বলে মনে করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ১৩.৮৩ শতাংশ এবং না বলেছেন ৮৩.৯৬ শতাংশ ভোটার। দৈনিক ইত্তেফাকের গত ৬ জুন প্রকাশিত সংখ্যার জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার আগেই বিরোধী দলের হরতাল আহ্বান যৌক্তিক হয়েছে বলে মনে করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৬৪ শতাংশ এবং না বলেছেন ৩৫ শতাংশ ভোটার। গত ১০ জুন প্রকাশিত দৈনিক কালের কণ্ঠের জরিপের প্রশ্ন ছিল ‘সরকার গত বছর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেয়া বাজেট প্রস্তাব না মানায় দেশের অর্থনীতি আজ ভেঙে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন খালেদা জিয়া। আপনি কি এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৭০.৯৫ শতাংশ এবং না বলেছেন ২৯.০৫ শতাংশ। একই পত্রিকায় গত ৯ জুন প্রকাশিত সংখ্যার প্রশ্ন ছিল ‘আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন- বিরোধী দল না এলেও সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বিরোধী দল ছাড়া এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াকে আপনি সমর্থন করেন কি?’ এ প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ১৪.৬৫ শতাংশ এবং না বলেছেন ৮৫.৩৫ শতাংশ ভোটার
।

Tuesday, 31 May 2011

সংবিধান সংশোধন কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্ত : এবার রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ যাচ্ছে



সংসদ রিপোর্টার
সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকছে না। সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি তাদের সুপারিশে এ বিষয়ে নেতিবাচক প্রস্তাবনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম বিষয়টি ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে পাওয়া প্রস্তাবনা বিবেচনা করে কমিটির অধিকাংশ সদস্য খসড়া সুপারিশে এটা না রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর বিধায় কমিটির কয়েকজন সদস্য এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার ওপর ফেলে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বিবেচনা করে বিশেষ কমিটি এর আগে রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার বিষয়ে একমত হলেও গতকাল অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এটা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ক (২ক) অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে ‘প্রজাতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বী মানুষ স্ব স্ব ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার পাইবে’ এ ধরনের বক্তব্য সম্বলিত একটি লিখিত প্রস্তাব দেন। খসরু শিরোনামে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ শব্দটি পরিবর্তন করে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’-এর কথা বলেন। কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সদস্য রাশেদ খান মেননও গতকাল পৃথক লিখিত প্রস্তাবনা দেন। অবশ্য রাশেদ খান মেনন দলীয়ভাবেও এর আগে এ ধরনের প্রস্তাব বিশেষ কমিটিকে দিয়েছেন। সদস্যদের এ প্রস্তাবনার পাশাপাশি রাজনীতিক, সাবেক বিচারপতি ও আইনজ্ঞ, পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে কমিটির সংলাপ, ৫ বাম দল, কমিউনিস্ট পার্টি, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সঙ্গে মতবিনিময়ের সুপারিশ ও প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সংলাপে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রধর্ম না রাখার প্রস্তাব এসেছে উল্লেখ করে গতকাল কমিটির একাধিক সদস্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনেন। ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম থাকার সুযোগ নেই বলেও কমিটির একাধিক সদস্য মন্তব্য করেন। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করে রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে ‘স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পক্ষেও মত দেন। পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন আলোচনা করে কমিটির সদস্য ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ এর পরিবর্তে তারা ‘প্রজাতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ/জনগণের ধর্ম ইসলাম’ এমন শব্দগুলো যুক্ত করার সুপারিশ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সুপারিশে হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের কথা এবং শিরোনামে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ শব্দের পরিবর্তে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ বা অন্য কোনো বিকল্প শব্দ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। অবশ্য কমিটি তাদের এ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করবে। তার পরই এ বিষয়ে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করবে।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে রয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে’। আর এ অনুচ্ছেদটির শিরোনাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্রধর্ম’। এ বিষয়ে কমিটির সদস্য রাশেদ খান মেনন গতকাল বৈঠকের পর আমার দেশ’র কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় সুপারিশে রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে পরিবর্তন আনার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে গতকাল আলোচনা হয়েছে। কমিটি এ অনুচ্ছেদে ভাষাগত পরিবর্তনের চিন্তা করছে। ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে রাশেদ খান মেনন রাষ্ট্রধর্মের বিপক্ষে বলেও গতকাল আমার দেশকে জানান।
এদিকে গতকালের বৈঠকে কমিটি ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন, ১২ অনুচ্ছেদ (চার মূলনীতি) পুনর্জীবিতকরণ, নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করা, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রাখার পাশাপাশি বিচারপতিদের চূড়ান্ত অভিসংশন সংসদের হাতে রাখা, সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণসহ বেশকিছু বিষয়ে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।
কমিটির সুপারিশ অনুসারে সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার বিধান সম্বলিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্তমান বিধানের পরিবর্তে কেবলমাত্র অনাস্থা প্রস্তাব, অর্থবিল (বাজেট) ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাজনিত বিষয় ছাড়া অন্য যে কোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন কথা যুক্ত করা হয়েছে।
বিচারপতিদের অভিসংশন বিষয়ে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যক্রম সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা তদন্তের ভার এই কাউন্সিলের উপরই বর্তাবে। তবে তদন্ত শেষে কাউন্সিলের আর কিছু করার থাকবে না। তাদের দেয়া তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী সংসদই অভিযুক্ত বিচারকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। পরবর্তীতে সংসদের এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা হবে।
সূত্র জানিয়েছে, কমিটি আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে নির্বাচিত সরকারের অধীনে করা যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, শক্তি, জনবল, আর্থিক স্বাধীনতাসহ নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক শক্তিশালী করার সুপারিশ করছে। এক্ষেত্রে নির্বাচন চলাকালে নিয়োগ, বদলিসহ যাবতীয় কার্যক্রম কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এ সময় সরকারের ভূমিকা হবে বর্তমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো। অর্থাত্ ওই সময়ে সরকার রুটিন কাজের বাইরে কিছু করতে পারবে না। কমিটি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংসদের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠনসহ কমিশনারের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করার সুপারিশ করবে।
গতকালের বৈঠকে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের আলোকে আগামী দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত হলেও কী পদ্ধতিতে এ ব্যবস্থা বহাল রাখা হবে সে বিষয়ে কমিটি কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে কমিটি ৩/৪টি বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ করে কমিটি এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে পৌঁছবে বলে সূত্র জানিয়েছে। গতকালের বৈঠকে বিশেষ কমিটি স্বল্পসময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য কমিটির চেয়ারম্যান সাজেদা চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণের। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আরেকটি বৈঠক করে কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করবে
।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি








বশীর আহমেদ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি। শুধু রাষ্ট্রদূত পদে নয়, ফার্স্ট সেক্রেটারি থেকে শুরু করে সহকারী সচিবের মতো মধ্যম ও নিম্নস্তরের কূটনীতিক পদে চলছে চুক্তিভিত্তিতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। এ পর্যন্ত ১২ জনকে রাষ্ট্রদূত এবং ১১ জন দলীয় ক্যাডার, ক্যাডারদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনকে মধ্যম এবং নিম্নস্তরের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন যারা অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত। অনেকে ছিলেন গৃহিণী। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কোনো যোগ্যতাই নেই এসব দলীয় ক্যাডারের। এ নিয়ে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা এবং ক্ষোভ। দলীয় ক্যাডারদের এই নিয়োগের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ভারত এবং জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনসহ মোট ১২টি মিশনে দলীয় লোকদের চুক্তিভিত্তিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
এখন নিচের পদে চলছে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহ-সভাপতি ওয়াহিদুর রহমান টিপুকে ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তার পেশা ছিল রাজনীতি। ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক এক আওয়ামী লীগ এমপির ছেলে শাহেদুর রহমানকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনসুলেটে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তার পেশা ছিল রাজনীতি। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েত-মৈত্রী হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অপর্ণা পালকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব (কনসুলার) পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অপর্ণা পাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন এবং তিনি অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত।
অপর্ণা পাল এখন কানাডায় পোস্টিং নেয়ার চেষ্টা করছেন।
ছাত্রজীবনে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম ওয়াইসুজ্জামানের স্ত্রী মৌসুমী ওয়াইসকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব (বাজেট) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাসুম আহমেদকে নেদারল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে সেকেন্ড সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তিনি পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এপিএস ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম রুহুল আমীনের স্ত্রী আনিসা আমীনকে প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী।
ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী এবং ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নার স্ত্রী ইরিন পারভীন বাঁধনকে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সেলর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক ফারুক আমীনের স্ত্রী রওনক আমীনকে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী। বিডিআর বিদ্রোহে নিহত এক সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর এপিএস (২) সাইফুজ্জামান শেখরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীমা পারভীনকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের পরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম শিকদার মোহাম্মদ জাহিদুর রহমানের স্ত্রী চৌধুরী সুলতানা পারভীনকে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনসুলেটে কনসল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী।
এছাড়া বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুরস্কার হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সাবেক কূটনীতিক তারিক এ করিমকে ভারতে, সাবেক কূটনীতিক আকরামুল কাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম সাইদুর রহমান খানকে ব্রিটেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রীর ভাই ড. আবদুল মোমেনকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় অযোগ্য ও বিতর্কিত ড. নিমচন্দ্র ভৌমিককে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে পেশাদার কূটনীতিকদের বাদ দিয়ে চীনে সাবেক কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ, ওমানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নূরুল আলম, রাশিয়ায় ড. এসএম সাইফুল হক, পাকিস্তানে মো. সোহরাব হোসেন, ইরাকে মুহাম্মদ কামালউদ্দিন, লিবিয়ায় মুহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং শেখ কামালের বন্ধু ও আবাহনী ক্লাবের সাবেক পরিচালক শাহেদ রেজাকে দলীয় লোক হিসেবে কুয়েতে রাষ্ট্রদূত পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ক্ষমতায় আসতে নানাভাবে সহায়তা করার পুরস্কার হিসেবে এদের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া ১/১১’র অন্যতম প্রধান হোতা লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হাইকমিশনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় বহাল তবিয়তে রেখেছে বর্তমান সরকার।
দলীয় ক্যাডারদের এই নিয়োগের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, অতীতে কখনও এভাবে অযোগ্য দলীয় ক্যাডার এবং তাদের আত্মীয়স্বজনদের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। পেশাদার কূটনীতিকদের বাদ দিয়ে এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে যে দলীয়করণ শুরু হয়েছে তাতে অকার্যকর হতে চলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে মেধাবীরা আর কূটনীতিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইবে না। এছাড়া দলীয়করণের ফলে কূটনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
এদিকে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

সংবিধান সংশোধনে আওয়ামী লীগের প্রস্তাব প্রতারণা : কাদের সিদ্দিকী










স্টাফ রিপোর্টার

কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, সংবিধানে একইসঙ্গে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতা রাখার প্রস্তাবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তারা এ প্রস্তাব দিয়েছে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। কারণ ইসলাম ও বিসমিল্লাহ সংবিধান থেকে তুলে দেয়া হলে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জিততে পারবে না। আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করতেই তারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সামাজিক সংগঠন ‘মুক্তচিন্তা’ আয়োজিত ‘যুুদ্ধাপরাধ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হাবিবুর রহমান বীরপ্রতীক, অ্যাডভোকেট হেদায়েত উল্লাহ প্রমুখ।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। কারণ এ ধরনের জোড়াতালির সংবিধান দিয়ে দেশ চলতে পারে না। সংবিধান সংশোধনে দেশের সব মানুষের সম্মতি প্রয়োজন। কারণ ছোটখাটো পরিবর্তনের ক্ষমতা সংসদের ওপর দেয়া হলেও সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের ক্ষমতা কখনও কোনো দেশ সংসদকে দেয়নি। মহাজোট সরকার যদি মনে করে সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে যা খুশি তাই করতে পারবে, তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার নিজেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আন্তরিক নয়। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য এ বিচার নয়, নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য এ বিচার। আর এ কারণেই সরকার বিষয়টিকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে জনগণকে ধৈর্য ধরতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান তারই ইঙ্গিত বহন করে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের যদি নির্যাতনের স্বভাব হয়ে যায় তবে তার হাত থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। কলেজছাত্র লিমনও পায়নি। লিমনকে পঙ্গু করে কারাগারে পাঠিয়ে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা অমানবিক। দেশের বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ও জজ কোর্ট মিশে একাকার হয়ে গেছে। কাগজ-কলমেই শুধু স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকলে হবে না, বাস্তবেও থাকতে হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমেরিকার ভাড়াটিয়া ও বাংলাদেশী কুচক্রীরা হত্যা করেছে। ওসামা বিন লাদেন ও বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকার আমেরিকার নেই। নিরস্ত্র লাদেনকে হত্যা করে তারা এ অধিকার হারিয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের সমর্থন নির্বাচনের সময়ের চেয়ে অনেকগুণ কমেছে। সরকার কোনো একটি গ্রামের ২ জনকে চাকরি দিতে পারেনি। বর্তমানে দুর্নীতি বেড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশেহারা। হাজারো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও সরকার কিছুই পূরণ করছে না
।

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সুপারিশ : বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা যাবে না








সংসদ রিপোর্টার

সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন আওয়ামীপন্থী কয়েকজন বুদ্ধিজীবী। তাদের মতে, সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ বিষয়গুলো রাখা যাবে না। দু’একজন বুদ্ধিজীবী আবার রাষ্ট্রধর্মের বিরোধিতা করলেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। এদিকে বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংশোধনের জন্য দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিবর্তন বা সংশোধন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। এ বিষয়ে বড় দুই রাজনৈতিক দল একমত না হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা অর্থবহ হবে না; বরং এতে সংঘাত-সংঘর্ষ আরও বাড়বে। কেউ কেউ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রস্তাব দেন। একজন বুদ্ধিজীবী বিতর্ক এড়াতে সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
গতকাল সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়কালে দেশের এসব বুদ্ধিজীবী তাদের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। বিশেষ কমিটির সভাপতি সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে ১১টার দিকে এ সভা শুরু হয়ে দুপুর পৌনে ২টা পর্যন্ত চলে। বৈঠকে ২৬ জন বুদ্ধিজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাদের মধ্যে ১৯ জন কমিটির সামনে তাদের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সংশোধন, রাষ্ট্রধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সংবিধানের মূলনীতি, বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা, মৌলিক অধিকার, সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও জাতির জনকের নাম অন্তর্ভুক্তি, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ভোটদান, নারী আসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিজীবীরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান, সাবেক উপদেষ্টা এএসএম শাহজাহান, টিআইবি চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা, সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সদস্য সচিব ড. বদিউল আলম মজুমদার, সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, কবি সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) নেতা শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আআমস আরেফিন সিদ্দিক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান অংশ নেন। বিশেষ কমিটির আমন্ত্রণ পেলেও অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ড. অজয় রায়, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও কলামিস্ট মাহফুজউল্লাহ অংশ নেননি।
কবীর চৌধুরী : বৈঠক থেকে বেরিয়ে আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম এবং ধর্মীয় রাজনীতি সংবিধানে থাকতে পারে না। তিনি ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছেন উল্লেখ করে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ সংবিধান থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্মের অপব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দেন। তিনি মৌলিক অধিকারের বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলেছেন বলে জানান।
কবীর চৌধুরী জানান, বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আজ মিশ্র প্রস্তাব এসেছে। অনেকে বলছেন এই ব্যবস্থার দরকার নেই। অনেকে বলেছেন দুই মেয়াদের পর এই বিধান উঠিয়ে দেয়া উচিত। তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ।
আকবর আলি খান : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। এটার জন্য বড় দুটি রাজনৈতিক দল একমত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে কোনো লাভ হবে না বরং সংঘাত আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা করে সংশোধন করা উচিত। এ সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও তাদের বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতার পথ বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে নির্বাচন পদ্ধতি বলতে যা আছে তাতে জালিয়াতি হয়। এতে সঠিকভাবে জনমত প্রতিফলিত হয় না। এজন্য কী ধরনের নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতাই নেই। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা হওয়া উচিত। তার মতে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি প্রধানমন্ত্রীর কোনো সুপারিশে একমত না হন তবে তা পুনর্বিবেচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদে পাঠানোর বিধান রাখার প্রস্তাব করেছি।
রেহমান সোবহান : আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার কথা বলেছি। তার মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সব উপদেষ্টা নির্দলীয় না হোক অন্তত নিরপেক্ষ হতে হবে।
সুলতানা কামাল : অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে রেহমান সোবহানের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি মানুষের পূর্ণ আস্থা নেই। এ অবস্থান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তবে যতদিন এটা বহাল থাকছে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মনোনীত করতে হবে। প্রধান বিচারককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তার মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ভোটদানের ক্ষেত্রে বাজেট সংক্রান্ত এবং অনাস্থা প্রস্তাবের বিষয়টি বাদ রেখে বাকি বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার দরকার আছে। তিনি বলেন, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়ার বিধান যুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সংবিধানে জাতির জনক ও ঘোষকের নাম যুক্ত করা উচিত নয়। এ বিষয়টি যাতে না থাকে সেজন্য কমিটির কাছে প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তিনি জানান, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, স্পর্শকাতর বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে অন্যদের ইস্যু তৈরির সুযোগ যেন না দেয়া হয়। মুজিবনগর সরকারের ওই দিনটি সংবিধানে থাকলেই চলে। আমি বলেছি, এমন কোনো বিধান রাখা যাবে না যাতে পরবর্তী সরকার এসে তা পরিবর্তন করতে পারে। এছাড়া তিনি সংবিধান সংশোধনে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থনের স্থলে তিন-চতুর্থাংশ রাখার প্রস্তাব করেছেন।
আবুল মকসুদ বলেন, সংরক্ষিত নারী আসন বাড়ানোর বিরোধিতা করেছি। মনোনয়ন বাড়িয়ে সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছি।
আসিফ নজরুল : অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল তার প্রস্তাবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল চালু রাখার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম এক সঙ্গে থাকতে পারে না। তাই আমি বলেছি, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা হলে রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে, অবশ্যই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ থাকা উচিত। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অতিমাত্রায় ক্ষমতা ভোগ করছে মন্তব্য করে আসিফ নজরুল তার প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলেন। তিনি বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে ’৭২ সালের সংবিধানের বিধান হুবহু প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের মতামত নেয়ার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করেন। তিনি বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি সংসদে উত্থাপনের বিধান রাখার প্রস্তাব দেন।
সৈয়দ শামসুল হক : আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেন, রাষ্ট্রধর্ম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এগুলো সংবিধানে রাখা যাবে না। দুই জেনারেল (জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ) সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটা ছিল তাদের মতলবি কাজ। এখন সেটা করার তো দরকার নেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৭২-এর সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বাদ রেখে যদি নিজেকে মুসলমান প্রমাণ করতে পারেন তবে এখন কিসের সমস্যা?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নাগরিকদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সব মৌলিক অধিকার সংবিধানে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়টি নিয়ে কমিটির কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ৭০ অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিধান আরও নমনীয় করা দরকার বলে আমরা জানিয়েছি।
তিনি রাষ্ট্রধর্মের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, কোনো বিশেষ ধর্মকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্যের সৃষ্টি হবে।
আরেফিন সিদ্দিক : অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক সংবিধান সংশোধনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রস্তাব সমর্থন করেছেন বলে বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের জানান।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের জাতীয় দলিল। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহন করে। তাই এই বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কমিটিতে অভিমত দিয়েছি। এছাড়াও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্ধারিত ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হলে সংসদ পুনরুজ্জীবিত করে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করেছি। পাশাপাশি তিনি ৭ মার্চের ভাষণকে সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
ড. মিজানুর রহমান : ড. মিজানুর রহমান সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, ওই অনুচ্ছেদে লেখা আছে—কোনো নাগরিকের প্রতি অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না। এই বিষয়টির সঙ্গে যদি এটি লঙ্ঘন করা হয় তাহলে ওই ব্যক্তি শাস্তিযোগ্য এটা অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে আমি মত দিয়েছি।
এবিএম মূসা : প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়েছে। এই খণ্ডকালীন সরকারকে নির্দলীয় বলা হলেও ‘নিরপেক্ষ’ কোথাও উল্লেখ নেই। এই বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য কমিটিকে পরামর্শ দিয়েছি।
শাহরিয়ার কবির : আওয়ামী লীগকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে বিশেষ কমিটির বৈঠকে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী ও ঘাদানিক নেতা শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেছেন, সংশোধিত সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ রাখার প্রস্তাব দিয়ে দলটি (আওয়ামী লীগ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। বৈঠকে শাহরিয়ার কবির উত্থাপিত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত ৫ম সংশোধনী বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে আদি সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণভাবে পুনঃস্থাপিত হয়েছে। ৫ম ও ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ যুক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, ওই সংশোধনী দুটি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যার সঙ্গে ইসলামপ্রীতির কোনো সম্পর্ক নেই।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : আওয়ামী বুদ্ধিজীবী সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারও রাষ্ট্রধর্মের বিরোধিতা করে বৈঠকে বলেন, একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার বিধান আর অন্যদিকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রাখা সাংঘর্ষিক। তাছাড়া রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান করলে সেটা সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হবে। তিনি বলেন, সংবিধান শুধু বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক আর বিশিষ্টজনদের জন্য নয়; এর মালিক জনগণ। তাই এটি সংশোধনের আগে তাদের মতামত নেয়ার সুপারিশ করেছি।
এম হাফিজউদ্দিন আহমদ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন আহমদ জানান, একমাত্র তিনিই সবার মতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব রেখেছেন। তিনি বলেন, ওই তিনটি (বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মভিত্তিক দল) বিষয়ে আমি তাদের সঙ্গে (বিশেষ কমিটির আমন্ত্রিত) একমত, বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এগুলোর বিরুদ্ধে বলেছিও। কিন্তু বৈঠকে এবার জানিয়েছি, এখন সংশোধনীতে এসব বাদ দিলে নতুন করে গণ্ডগোল লাগবে, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ‘বাস্তবতা’ বিবেচনায় বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মভিত্তিক দলের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়ার কথা জানান এম হাফিজউদ্দিন।
আজ সম্পাদকদের মতামত : আজ সকালে বিশেষ কমিটি দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করবে। বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে ২০টি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদককে মতবিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যেসব পত্রিকার সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেগুলো হলো—প্রথম আলো, আমার দেশ, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, দৈনিক ইত্তেফাক, ইনকিলাব, দিনকাল, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নয়া দিগন্ত, মানবজমিন, আমাদের সময়, জনকণ্ঠ, সমকাল, খবর, ডেইলি স্টার, নিউ নেশন, নিউএজ, ইনডিপেন্ডেন্ট, যায়যায়দিন, সংবাদ, ডেসটিনি, ভোরের কাগজ, নিউজ টুডে ও ডেইলি সান।
এর আগে গত ২৪ এপ্রিল সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করে। ২৫ এপ্রিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায় কমিটি। তবে বিএনপি ওই বৈঠকে অংশ নেয়নি
।